জনপ্রতিনিধিকে ‘ইচ্ছেমতো’ বরখাস্তের সুযোগ রেখে দিচ্ছে বিএনপি সরকারও

John Smith | আপডেট: ৫ এপ্রিল ২০২৬, ১:২৫ দুপুর

আইনে সংশোধনী আনার আগে জনপ্রতিনিধিদের অপসারণের স্পষ্ট শর্ত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ ও ‘জনস্বার্থে’ অপসারণের সুযোগ তৈরি করা হয়।

জনপ্রতিনিধিকে ‘ইচ্ছেমতো’ বরখাস্তের সুযোগ রেখে দিচ্ছে বিএনপি সরকারও

‘বিশেষ পরিস্থিতি’ বা ‘জনস্বার্থে’ স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্তের সুযোগ রেখে দিচ্ছে বিএনপি সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটার অপব্যবহারের আশঙ্কা আছে এবং তা স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের ‘ইচ্ছেমতো বরখাস্তের’ সুযোগ তৈরি করবে। এটা নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া বিএনপির প্রতিশ্রুতির বিপরীত।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ পরিস্থিতিতে চারটি অধ্যাদেশ জারি করে এই সুযোগ তৈরি করেছিল। কারণ, তখন স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের বড় অংশই আত্মগোপনে চলে গিয়েছিল। এতে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের নিয়মিত কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে। এ ছাড়া তৎকালীন সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্থানীয় সরকার থেকে বিদায় করার সিদ্ধান্ত ছিল।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪; স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪; জেলা পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪ ও উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪ জারি হয়। এতে বিশেষ পরিস্থিতি বা জনস্বার্থে জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্তের সুযোগ তৈরি করা হয়। যদিও বিশেষ পরিস্থিতি ও জনস্বার্থের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়নি। এর মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ ও প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি সরকারের হাতে দেওয়া হয়।

আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারির পর ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র, ৬০টি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সারা দেশের সব উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, নারী ভাইস চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়রদের অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। সেদিন পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের এই চার স্তরে সব মিলিয়ে ১ হাজার ৮৭৬ জন জনপ্রতিনিধিকে অপসারণ করা হয়।

চারটি অধ্যাদেশের উল্লেখযোগ্য দিক হলো, আইনের অন্যান্য ধারার ওপর প্রাধান্য দিয়ে (যা কিছুই থাকুক না কেন) সরাসরি নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ রাখা হয়। ফলে আগের মতো নির্দিষ্ট অভিযোগ, তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাধ্যবাধকতা ছাড়াই যাঁকে খুশি তাঁকে, যখন খুশি তখন অপসারণের পথ খুলে যায়।

বিএনপি সরকার গঠনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করেছে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। এই কমিটি ১১৭টি অধ্যাদেশ অনুমোদনের সুপারিশ করেছে। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি বাতিল করা ও ১৬টি এখনই সংসদে বিল আকারে না তোলার সুপারিশ করা হয়েছে, অর্থাৎ এই ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে। এর মধ্যে আছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত একটি, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়সংক্রান্ত দুটি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত তিনটি, গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত দুটি, দুদকসংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ।

যেসব অধ্যাদেশ বিএনপি রেখে দিচ্ছে বা আইন করার সুপারিশ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে স্থানীয় সরকারসংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো, যেখানে জনপ্রতিনিধিদের ‘ইচ্ছেমতো’ বরখাস্তের সুযোগ রাখা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গতকাল শনিবার জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্থানীয় সরকারসংক্রান্ত যে অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল, তা ইতিমধ্যে সংসদের বিশেষ কমিটির যাচাই-বাছাই শেষে সংসদে আইন আকারে উত্থাপনের জন্য অনুমোদিত হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এটি সংসদে উপস্থাপন করা হবে।

স্থানীয় সরকারসংক্রান্ত অধ্যাদেশের বরখাস্তকরণ–সম্পর্কিত ধারাকে ‘অগণতান্ত্রিক’ বলা হচ্ছে। তারপরও তা রাখা হচ্ছে কেন, জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বরখাস্ত যদি আইনসিদ্ধ হয়, তাহলে আমরা বরখাস্ত করব। আর যদি আইন পরিপন্থী হয়, সে ক্ষেত্রে যাঁকে বরখাস্ত করা হবে, তিনি আদালতে যেতে পারবেন। সমস্যা নেই।’

 

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.