সরকারে জায়গা পেয়েছেন মাত্র তিনটি শরিক দলের তিনজন নেতা। এতে শরিকদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁরা বলছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে এটা তো বিএনপি সরকার।
তখন ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ সরকার। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে। ২০২২ সালে ২৮ মার্চ, লন্ডনে সেখানে স্বাধীনতা দিবসের এক আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি প্রথম ঘোষণা দেন, সরকারবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত দলগুলোকে নিয়ে একসঙ্গে আন্দোলন, একসঙ্গে নির্বাচন করবেন। নির্বাচনে জয়ী অথবা পরাজিত সবাইকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করবে বিএনপি। এরপর ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগপর্যন্ত বিএনপির নেতারা জাতীয় সরকারের কথা প্রায়ই বলতেন।

নির্বাচনের ঠিক আগে, ৪ জানুয়ারি, সিলেটে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বিষয়টির উল্লেখ করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘বিএনপি জনমতের ওপর বিশ্বাসী। নির্বাচনে জয়লাভ করলে আমরা একা সরকার গঠন করব না; বরং যারা দীর্ঘ সময় আমাদের সঙ্গে রাজপথে যুগপৎ আন্দোলন করেছে, তাদের নিয়েই একটি জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। তবে এটি কোনো সর্বদলীয় সরকার হবে না।’
জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলের নেতাদের ১৫টি আসন ছেড়ে দিয়েছিল। এর মধ্যে মিত্র পাঁচটি দলকে ছাড়া হয়েছিল আটটি আসন, যারা তাদের দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে। মিত্র পাঁচটি দলের মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে (খেজুরগাছ) চারটি এবং গণসংহতি আন্দোলন (মাথাল), বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি (কোদাল), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি (গরুর গাড়ি) ও গণ অধিকার পরিষদকে (ট্রাক) একটি করে আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে জয়ী হন মাত্র তিনজন। তাঁরা হলেন গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিজেপির আন্দালিভ রহমান পার্থ ও গণ অধিকার পরিষদের মো. নুরুল হক নূর।
এ ছাড়া আরও পাঁচটি শরিক দলের প্রধানসহ সাতজন নেতা নিজস্ব দল ভেঙে দিয়ে কিংবা বিএনপিতে যোগ দিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হন। তাঁরা নিয়েছিলেন ধানের শীষ প্রতীক। তাঁরা হলেন বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ, গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (একাংশ) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাস। এর মধ্যে কেবল শাহাদাত হোসেন সেলিম ও ববি হাজ্জাজ জয়ী হন।
নির্বাচনী ফলাফল দেখা যায়, শরিকদের ছেড়ে দেওয়া আসনে বিএনপি কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি। শরিক দলগুলোকে ছেড়ে দেওয়া ১৫টি আসনের মধ্যে মাত্র পাঁচটি আসনে জয় আসে। এই পাঁচ বিজয়ীর মধ্যে সরকারে ঠাঁই পান তিনজন। এর মধ্যে জোনায়েদ সাকি পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী, নুরুল হক প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। বাদ থাকেন শাহাদাত হোসেন সেলিম ও আন্দালিভ রহমান পার্থ।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাদ পড়া দুজনেই বিএনপির সঙ্গে বহু বছর ধরে আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে শাহাদাত হোসেন সেলিম বিগত যুগপৎ আন্দোলন ছাড়াও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংস্কারের আলোচনায় বিএনপির পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের যাত্রা শুরু হয় ১৭ ফেব্রুয়ারি। ৫ জুন সরকারের ১০৯ দিন অতিবাহিত হয়। নির্বাচনের আগের প্রতিশ্রুত ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের বিষয়ে কথা হয় যুগপৎ আন্দোলনের একাধিক শরিক নেতার সঙ্গে।
‘কোকাকোলা ভোটের আগে ফস করে’
যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপির অন্যতম শরিক জোটের একটি হচ্ছে গণতন্ত্র মঞ্চ। সে জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না, তাঁর দল নাগরিক ঐক্য। বিএনপি তাঁকে প্রার্থী করেনি। এ নিয়ে নির্বাচনের আগমুহূর্তে কিছুটা তিক্ততাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরে কোনো পক্ষই বিষয়টি নিয়ে আগ বাড়ায়নি। এখনো বিএনপির সঙ্গে মাহমুদুর রহমান মান্নার সম্পর্ক অনেকটা সে অবস্থাতেই রয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
আন্দোলনের সময় বিএনপির ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে মাহমুদুর রহমান মান্না শ্লেষ প্রকাশ করেই প্রথম আলোকে বলেন, ‘কথায় আছে না, কোকাকোলা ভোটের আগে ফস করে, ভোটের পরে করে না।’
ভোটের পরে বিএনপি যে জাতীয় সরকারের ধারণা থেকে সরে গেছে, সেটির উল্লেখ করে মান্না বলেন, ‘বিএনপি যা বলেছিল, সেটা তারা করেনি। বলতে পারেন, দুজনকে (মন্ত্রী) তো করা হয়েছে। কিন্তু এটা যে জোটের সরকার, সেটা তো বিএনপিও বলছে না। আমি বলব, যেটা হয়েছে সেটা বিএনপি সরকার। আর অন্য দল থেকে যে এক-দুজনকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে, এটা আমাদের দেশে একটা সিস্টেম হয়ে গেছে।’
‘রেইনবো সরকার না হলে রেইনবো নেশন কীভাবে হবে’
নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির সমর্থন পেয়েছিলেন গণতন্ত্র মঞ্চের আরেক শীর্ষ নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি দলের ‘কোদাল’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জামায়াতের প্রার্থীর কাছে বড় ব্যবধানে হেরে এখন কিছুটা নিষ্প্রভ।