ট্রাম্পের দাবি অস্বীকার ইরানের, বিশ্ববাজারে আবার বাড়ছে তেলের দাম

John Smith | আপডেট: ২৪ মার্চ ২০২৬, ৩:৩০ দুপুর

সোমবার একপর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৩ ডলারে উঠে গিয়েছিল। ট্রাম্পের মন্তব্যের পর তা দ্রুত ৯৬ ডলারে নেমে আসে, যদিও পরে তেলের দাম আবার কিছুটা বেড়েছে। আজ মঙ্গলবার সকালে এ প্রতিবেদন লেখার সময় তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১০৩ ডলার।

মঙ্গলবার দিনের শুরুতেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। সরবরাহ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হওয়ায় আজ দাম বাড়তে শুরু করেছে বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সংবাদে বলা হয়েছে।

মূলত ইরানের বক্তব্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। দেশটি জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা হয়নি।

ইরানের এ দাবি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের ঠিক উল্টো। ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, খুব শিগগির সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।

দুই পক্ষের এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থানে বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। অনিবার্যভাবেই তেলের দামে এর প্রভাব পড়বে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে জানান, সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘গঠনমূলক’ আলোচনা হয়েছে। তাঁর দাবি, দুই দেশ ‘পূর্ণাঙ্গ’ ও ‘চূড়ান্ত’ সমাধানের বিষয়ে কথা বলেছে। যদিও ইরান এ দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে।

ট্রাম্পের এ বক্তব্যের পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দ্রুত কমে যায়। এ ছাড়া গতকাল ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে।

সোমবার একপর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৩ ডলারে উঠে গিয়েছিল। ট্রাম্পের মন্তব্যের পর তা দ্রুত ৯৬ ডলারে নেমে আসে, যদিও পরে তেলের দাম আবার কিছুটা বেড়েছে। আজ মঙ্গলবার সকালে এ প্রতিবেদন লেখার সময় তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১০৩ ডলার। অর্থাৎ গতকাল তেলের সর্বোচ্চ দামের তুলনায় আজ তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার কম। খবর বিবিসির

তেলের দাম কমার সঙ্গে শেয়ারবাজারে উত্থান দেখা গেছে। লন্ডনের এফটিএসই ১০০ সূচক দিনের শুরুতে ২ শতাংশের বেশি পড়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত সূচকের মান প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থায় দিনের লেনদেন শেষ হয়।

জার্মানির ড্যাক্স সূচক ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং ফ্রান্সের সিএসি সূচক প্রায় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১ দশমিক ১ শতাংশের বেশি এবং ডাও জোন্স প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।

তবে ট্রাম্পের এ বক্তব্যের আগেই এশিয়ার বাজার বন্ধ হয়ে যায়। এশিয়ার বাজারে গতকাল বড় ধরনের পতন হয়েছে। জাপানের নিক্কেই সূচক ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যায়।

এর আগে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘ধ্বংস করে দেওয়া হবে’। জবাবে ইরান জানিয়েছিল, এমন হামলা হলে তারা মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত হানবে।

গত সপ্তাহের শেষে এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে বিশ্ববাজারে উদ্বেগ বেড়ে যায়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাত দীর্ঘায়িত হতে পারে—এমন আশঙ্কা জোরালো হয়।

এ পরিস্থিতিতে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে; কারণ, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসা তেল ও গ্যাসের ওপর তারা ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অথচ ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ কার্যত বন্ধ রয়েছে।

বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং দাম বেড়েছে।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে জানান, ‘গভীর, বিস্তারিত ও গঠনমূলক’ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি পাঁচ দিনের জন্য ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে চলমান আলোচনার অগ্রগতির ওপর বিষয়টি নির্ভর করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা হয়নি। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফও একই দাবি করে বলেন, ‘ভুয়া তথ্য দিয়ে বাজারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।’

বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের মন্তব্যে বিনিয়োগকারীরা স্বস্তি পেলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। ওয়েলথ ক্লাবের বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুসানাহ স্ট্রিটার বলেন, ইদানীং তো প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে আবার ভেঙেও যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে এ ধরনের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ।

সুসানাহর মতে, তেলের দাম এখনো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ভোক্তারা জ্বালানি ব্যয় নিয়ে চাপেই থাকবেন। সরবরাহপথে বিঘ্ন ও অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে যুদ্ধবিরতি হলেও শিগগিরই যে স্বাভাবিকতা ফিরবে—এমন সম্ভাবনা কম।

ইতিমধ্যে এ সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। ফলে অনেক দেশে জ্বালানির ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জ্বালানি–সংকটের শঙ্কা

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরোল সতর্ক করে বলেছেন, চলমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্বালানি–সংকটে পড়তে পারে বিশ্ব। ১৯৭০-এর দশকের তেল–সংকট এবং ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের যে প্রভাব, বিদ্যমান পরিস্থিতিকে তিনি সেই সংকটের সঙ্গে তুলনা করেন। খবর বিবিসির

এদিকে যুক্তরাজ্যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা জোরালো হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার রোববার ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

এদিকে যুদ্ধ নিয়ে অনিশ্চয়তা যে বাড়ছে, তার আরেকটি প্রমাণ হলো, যুক্তরাজ্য সরকারের ঋণ নেওয়ার সুদহার দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। সোমবার ১০ বছর মেয়াদি ঋণের সুদ একপর্যায়ে ৫ দশমিক ১২ শতাংশে উঠলেও ট্রাম্পের মন্তব্যের পর তা কিছুটা কমে প্রায় ৪ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসে।

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.