ইরান যুদ্ধের আঁচ মার্কিনদের গায়ে, তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি

John Smith | আপডেট: ১৩ মে ২০২৬, ১২:৫০ দুপুর

ইরান যুদ্ধের আঁচ এবার মার্কিন নাগরিকদের গায়ে লাগতে শুরু করেছে। তিন বছরের মধ্যে এবারই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির হার ছাড়িয়ে যেতে পারেনি।

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএলএস) সর্বশেষ কনজ্যুমার প্রাইস ইনডেক্স (সিপিআই) তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে মাসভিত্তিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ০ দশমিক ৬ শতাংশ। এতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০২৩ সালের মে মাসের পর সর্বোচ্চ। খবর সিএনএনের

অর্থনীতিবিদেরা ধারণা করেছিলেন, মার্চের তুলনায় এপ্রিলে দাম বাড়বে ০ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বার্ষিক মূল্যস্ফীতি হবে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছিল। এরপর মার্চ মাস থেকেই তা বাড়তে শুরু করে। এখন ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির উচ্চ মূল্যের ধাক্কা বহু বছর ধরে উচ্চ মূল্যের চাপে থাকা মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

লয়োলা মেরিমাউন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও অর্থ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক সাং-ওন সন মঙ্গলবার লিখেছেন, ‘ভোক্তাদের জন্য এর অর্থ হলো, জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো অস্বস্তিকর। ফেডারেল রিজার্ভের জন্য এর মানে সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে আরও পিছিয়ে যাওয়া।’

বাড়ছে খাদ্য, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম

কোভিড-পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতির ঢেউ তৈরি হয়েছিল। ২০২২ সালের গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির হার চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছায়। এতে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যায়। তবে সম্প্রতি মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসায় অন্তত মার্কিন নাগরিকদের একাংশের আয় মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি হারে বেড়েছে।

কিন্তু গত মাসে সেই চিত্র বদলে গেছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলের পর এবারই প্রথম মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর ঘণ্টাপ্রতি গড় মজুরি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়েছে। গত বছরের এপ্রিলের তুলনায় গড়ে বেতন বেড়েছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, কিন্তু একই সময়ে দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।

পিএনসি ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস গ্রুপের প্রধান অর্থনীতিবিদ অগাস্টিন ফশে সিএনএনকে বলেন, ভোক্তারা আগে থেকেই চাপে ছিলেন। এর মধ্যে শ্রমবাজারেও দুর্বলতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

বিষয়টি হলো, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। সমস্যা শুধু তেলের নয়। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সার, অ্যালুমিনিয়াম ও হিলিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে পেট্রলপাম্প, মুদিদোকান ও বিদ্যুতের বিলে।

মার্চ মাসে গ্যাসের দাম রেকর্ড ২১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এপ্রিলেও দাম বেড়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ, ২০২৩ সালের শেষভাগের পর এটা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধি।

ডেটা সেন্টারের বাড়তি বিদ্যুৎ–চাহিদা, আবহাওয়া ও অবকাঠামোগত ব্যয়ের কারণে গত বছর থেকেই বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। এখন বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস–সংকটের কারণে সেই চাপ আরও বেড়েছে। এপ্রিল মাসে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ১ শতাংশ, চার বছরের বেশি সময়ের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধি।

গত মাসে সামগ্রিকভাবে খাদ্যের দাম বেড়েছে ০ দশমিক ৫ শতাংশ। মুদিপণ্যের দাম বেড়েছে ০ দশমিক ৭ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে খাদ্য ও মুদিপণ্যের দাম বেড়েছে যথাক্রমে ৩ দশমিক ২ ও ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

বিশেষ করে গরুর মাংসের দাম বাড়ছে। সেই সঙ্গে ফল ও সবজির দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ডিজেলচালিত রেফ্রিজারেটেড ট্রাকে পরিবহন করা হয়—এমন তাজা ফল ও সবজির দাম এপ্রিল মাসে ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে, ২০১০ সালের পর এ খাতে সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধি।

টমেটোর দাম টানা দ্বিতীয় মাসের মতো ১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

আরএসএম ইউএসের প্রধান অর্থনীতিবিদ জো ব্রুসুয়েলাস সিএনএনকে বলেন, যুদ্ধ এখন আমেরিকার ঘরে পৌঁছে গেছে। বাজারের ব্যাগেই তার আঁচ টের পাওয়া যাচ্ছে।

পরিবার ও ফেড—উভয়ের জন্যই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি

খাতওয়ারি হিসাবে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে, তার প্রায় ৪০ শতাংশ হয়েছে জ্বালানির দামের কারণে। তবে আবাসন খাতেরও বড় ভূমিকা আছে। সরকারি কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণে গত বছরের একটি পরিসংখ্যানগত সমন্বয়ের প্রভাবও এপ্রিলে পরিসংখ্যানে পড়েছে।

সিপিআই সূচকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় আবাসন খাত। এপ্রিল মাসে এই খাতের মূল্যস্ফীতি ছিল ০ দশমিক ৬ শতাংশ, মার্চের তুলনায় দ্বিগুণ।

গত অক্টোবরে সরকারি অচলাবস্থার কারণে বিএলএস পুরোপুরি তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি। ফলে ওই মাসে ভাড়াভিত্তিক মূল্যস্ফীতি শূন্য ধরে নেওয়া হয়েছিল। ফলে গত বছরের শেষ দিকে যে মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান দেখা গেছে, তা প্রকৃত মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম।

প্যানথিয়ন ম্যাক্রোইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ অলিভার অ্যালেন বলেন, ওই ‘পরিসংখ্যানগত বিকৃতি’ প্রকৃত মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

এদিকে খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থির খাত বাদ দিয়ে যে কোর সিপিআই হিসাব করা হয়, এপ্রিল মাসে তা ০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। বার্ষিক হিসাবে এর হার দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৮ শতাংশে, এটাও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি।

আবাসন খাত ছাড়াও বিমানভাড়া বৃদ্ধি এবং নেটফ্লিক্সের মতো ভিডিও ও অডিও সেবার মূল্যবৃদ্ধির কারণেও কোর মূল্যস্ফীতি বেশি ছিল বলে মনে করছেন অ্যালেন।

তবে অ্যালেনের মতে, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কিছু অংশ সাময়িক। শুল্কজনিত মূল্যস্ফীতির প্রভাবও অনেকটা শেষ হয়ে এসেছে।

অ্যালেন বলেন, আগামী কয়েক মাস সময়টা অস্বস্তিকর হবে। কিন্তু ২০২১ ও ২০২২ সালের মতো প্রতি মাসে লাগামহীন মূল্যস্ফীতির পুনরাবৃত্তি হবে বলে মনে হয় না। তবে এতে ফেডারেল রিজার্ভ কঠিন অবস্থায় পড়েছে বলেও মনে করেন তিনি।

অ্যালেনের ভাষায়, ‘ফেড যদি শ্রমবাজার ও প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করতে চায়ও, কোর মূল্যস্ফীতি যখন ৩ শতাংশের দিকে এগোচ্ছে, তখন সুদহার কমানোর যৌক্তিকতা দেখানো কঠিন।’

মূল্যস্ফীতি যেমন দ্রুত বাড়ছে, তেমনি অর্থনৈতিক অসন্তোষ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে। এসএসআরএস পরিচালিত সিএনএনের জরিপে দেখা গেছে, ৭৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক—যাঁদের মধ্যে রিপাবলিকানদের বড় অংশও রয়েছেন—মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যে মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে, সেখানে এই মূল্যস্ফীতির প্রভাব পড়তে পারে। ট্রাম্প ইতিমধ্যে বলেছেন, ইরান যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিরাপত্তাজনিত হুমকি হয়ে উঠেছিল, তা মোকাবিলায় এই ছোট মূল্য মার্কিন নাগরিকদের দিতে হবে। তবে যুদ্ধ শেষ হলে তেলের দাম অনেকটা কমে আসবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সম্পদবৈষম্যও বেড়েছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো ক্রমেই বেশি চাপে পড়ছে এবং ঋণ সামাল দেওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।

এদিকে মঙ্গলবার নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের প্রকাশিত পৃথক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিক্ষাঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির হার বেড়েছে।

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.