বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার কি বিপর্যয়ের মুখে, কী হতে পারে

John Smith | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৭ দুপুর

তেলের ফিউচার (আগাম লেনদেন) বাজারের ব্যবসায়ীরা যেন সব সময়ই আশাবাদী। ১৭ এপ্রিল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হরমুজ প্রণালি ‘সম্পূর্ণ উন্মুক্ত’ ঘোষণা করার পর অপরিশোধিত ব্রেন্ট তেলের দাম ১০ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারে নেমে আসে।

কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অবস্থান বদলে ফেলে ইরান। তারা তেলবাহী এক ভারতীয় জাহাজে হামলা চালায়। পরের দিন ব্রেন্টক্রুডের দাম বাড়ে ৫ শতাংশ। এরপর তা আবার ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। তবে মার্চের শেষ দিকে তেলের যে সর্বোচ্চ দাম ছিল, এখন দাম তার চেয়ে প্রায় ১৫ ডলার কম, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে উপসাগরে বিপুল পরিমাণ তেল আটকা পড়েছে। আজ সকালে এই প্রতিবেদন লেখার সময় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলার। যুদ্ধ শুরুর পর দাম উঠেছিল সর্বোচ্চ ১১৯ ডলার।

ইরান যুদ্ধের ৫০ দিনে বিশ্ববাজার থেকে ৫৫ কোটি ব্যারেল উপসাগরীয় অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমেছে, গত বছরের বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ২ শতাংশ। হরমুজ প্রণালি যত দিন বন্ধ থাকবে, প্রতি মাসে বিশ্ব ৭০ লাখ টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে বঞ্চিত হবে, বার্ষিক সরবরাহের যা প্রায় ২ শতাংশের সমান। তবু পশ্চিমা দেশগুলোয় চাপ এখনো সীমিত। পেট্রলের দাম কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু বেশির ভাগ পরিবারের পক্ষে এখনো গাড়ি চালানো সম্ভব হচ্ছে। ট্রাক চলাচল থামেনি, উড়োজাহাজ উড়ছে আগের মতোই। জ্বালানির মজুতও যুদ্ধের আগের সময়ের কাছাকাছি। খবর দ্য ইকোনমিস্টের

তবে এই স্বস্তিদায়ক চিত্র দেখে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ আছে। বিষয়টি হলো, যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ অতিক্রম করা শেষ কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ ২০ এপ্রিলের মধ্যে মালয়েশিয়া ও ক্যালিফোর্নিয়ায় পৌঁছে যায়। ফলে সরবরাহের ধাক্কা থেকে বিশ্বকে রক্ষা করার মতো কোনো বাড়তি মজুত আর অবশিষ্ট নেই। বিষয়টি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে গ্রীষ্মকালীন ছুটির মৌসুম শুরু হচ্ছে, এই মৌসুমে জ্বালানির চাহিদা বেড়ে যায়।

prothomalo-bangla_2026-03-11_vcl7p5qe_iran-crisis-gulf-oman
ওমানের মাসকাটে নোঙর করে আছে ‘লুজিয়াশান’ নামের একটি ট্যাংকার। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংকটের মধ্যে তেহরান হরমুজ প্রণালি একরকম বন্ধ করে দেওয়ায় গত মাসে মাসকাটে এ দৃশ্য দেখা যায়।ছবি: রয়টার্স

বিশ্ব জ্বালানি বিপর্যয়ের কতটা কাছাকাছি, তা বুঝতে দ্য ইকোনমিস্ট বিভিন্ন সূচক প্রণয়ন করেছে। এতে দেখা যায়, ক্ষত ইতিমধ্যেই গভীর। প্রণালি দ্রুত না খুললে ব্যয় আরও বাড়বে, এমনকি এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যখন জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। এখনই প্রণালি খুলে দিলে বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব, কেবল তখনই সম্ভব। তবে কিছু অতিরিক্ত চাপ ইতিমধ্যেই অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

তেলের দাম বাড়লে মানুষ চাপে পড়ে। বাসভাড়া বাড়ে, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়। কৃষকের সেচ খরচ বাড়ে, ছোট ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে হিমশিম খায়। আয় না বাড়লেও ব্যয় বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে, দৈনন্দিন জীবন হয়ে ওঠে আরও অনিশ্চিত ও কঠিন।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি দ্রুত চাপে পড়ে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যায়, অবমূল্যায়ন হয় মুদ্রার। পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতি তীব্র হয়। সরকার ভর্তুকি দিতে গিয়ে বাজেট ঘাটতিতে পড়ে। বিনিয়োগ কমে, প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।

তিনটি বিষয়

বাস্তবতা হচ্ছে, তিনটি বিষয় বিশ্বকে এই সংকটের কিনারায় ঠেলে দিচ্ছে। প্রথমত, কেনাবেচার জন্য তেলের চালান দ্রুত কমে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, শোধনাগারগুলো জ্বালানি উৎপাদন কমাচ্ছে। তৃতীয়ত, ইউরোপের চাহিদা কৃত্রিমভাবে উচ্চ অবস্থায় আছে। ফলে বাজারের ভারসাম্য আনতে কোথাও না কোথাও বড় ধরনের সমন্বয় প্রয়োজন।

বাণিজ্যের দিকটি আগে দেখা যাক। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরবরাহ-সংকট সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক না ছড়ানোর কারণ হলো, যুদ্ধ শুরুর সময় সমুদ্রে প্রায় রেকর্ড পরিমাণ তেল ভাসমান অবস্থায় ছিল। ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ উপসাগরের দিকে রওনা দিলে ওই অঞ্চলের দেশগুলো রপ্তানি বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এসব চালান সম্প্রতি পৌঁছে যাওয়ার পর সেই অতিরিক্ত ভাসমান মজুত শেষ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ায় ইরান ও রাশিয়ার তেলের অনেক চালান ক্রেতা পেয়ে গেছে, সেগুলোও এখন শেষ। এসব তেল সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় ছিল। ফলে সমুদ্রে ভাসমান মোট তেলের পরিমাণ রেকর্ড গতিতে কমেছে। জেট ফুয়েল ও পেট্রলের ক্ষেত্রে তা ঐতিহাসিক গড়ের অনেক নিচে, এমনকি সামুদ্রিক বাণিজ্য সচল রাখতে সর্বনিম্ন যে পরিমাণ তেল প্রয়োজন, সেই পর্যায়ের কাছাকাছি নেমে এসেছে।

সবচেয়ে বিপদে এশিয়া

এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে এশিয়া। কেননা, উপসাগরীয় অঞ্চলের রপ্তানির পাঁচ ভাগের চার ভাগই যেত এই অঞ্চলে। কয়েকটি এশীয় দেশে বাণিজ্যিক মজুত দ্রুত শেষ হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া কৌশলগত মজুত থেকে সরবরাহ কমাতে যাচ্ছে। জাপানের মজুত মে মাসেই শেষ হয়ে যাবে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেয়ারোসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত এক মাসে চীন ছাড়া এশিয়ার অপরিশোধিত তেলের মজুত ৬ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল বা ১১ শতাংশ কমেছে।

কাঁচামালের ঘাটতিতে এশিয়ার শোধনাগারগুলো দৈনিক ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি উৎপাদন কমিয়েছে, অর্থাৎ তাদের মোট সক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ। স্পার্টা কমোডিটিজের নিল ক্রসবির মতে, মে মাসে এই ঘাটতি ৫০ লাখ ব্যারেল এবং প্রণালি বন্ধ থাকলে জুলাইয়ে ১ কোটি ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে। চীন চাইলে তাদের মজুত থাকা ১৩০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়তে পারে, কিন্তু তারা উল্টো পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি স্থগিত করেছে।

চীনের জ্বালানি কৌশলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যবসায়ী দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি না হলে চীন সরবরাহ বৃদ্ধি করবে না। ফলে উপসাগর থেকে পরিশোধিত জ্বালানির রপ্তানি বন্ধ হয়ে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা আরও তীব্র হচ্ছে।

ইতিমধ্যে পরিশোধিত জ্বালানির দাম অনেক বেড়েছে। এশিয়ার স্পটমার্কেটে প্রতি ব্যারেল পেট্রল প্রায় ১২০ ডলার, ডিজেল ১৭৫ ডলার ও জেট ফুয়েল ২০০ ডলারের বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে, যুদ্ধের আগে যা ছিল যথাক্রমে ৮০, ৯৩ ও ৯৪ ডলার। চাহিদাও কিছুটা সমন্বয় হচ্ছে, অংশত সরকারি নির্দেশে। সাতটি দেশ ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বাধ্যতামূলক করেছে এবং অন্তত পাঁচটি দেশে জ্বালানি রেশনিং চালু হয়েছে। উচ্চ দামের প্রভাবও পড়ছে—ছোট খনি, মৎস্য খাতসহ অনেক প্রতিষ্ঠান আংশিক সময় কাজ করছে। ন্যাপথার দাম বেড়ে যাওয়ায় কিছু প্লাস্টিক কারখানা উৎপাদন বন্ধ করেছে। ফলে এপ্রিলে ফেব্রুয়ারির তুলনায় এশিয়ার তেলের চাহিদা দৈনিক প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

prothomalo-bangla%2F2026-04-19%2Fl95n6fd7%2Firanwar.JPG?w=1536&auto=format%2Ccompress&fmt=webp

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশেও জ্বালানি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেল নেওয়ার জন্য রাজধানীর একটি পাম্পে লম্বা লাইন।

ইউরোপের অবস্থান

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ইউরোপ এখনো চাহিদা কমানোর পথে হাঁটেনি, তারা নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ দেশের মধ্যে ১৬টি দেশ জ্বালানি ভর্তুকি দিচ্ছে বা কর হ্রাস করেছে। ফলে ইউরোপের শোধনাগারগুলো উৎপাদন তেমন একটা কমায়নি। তবে তাদেরও ব্রেন্ট ফিউচারের তুলনায় অনেক বেশি দামে অপরিশোধিত তেল কিনতে হচ্ছে।

বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার জন্য ‘ডেটেড ব্রেন্ট’, অর্থাৎ আগামী কয়েক সপ্তাহে সরবরাহযোগ্য তেলের দাম, বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত ব্রেন্ট ফিউচার ও ডেটেড ব্রেন্টের পার্থক্য থাকে ১-২ ডলার, কিন্তু এপ্রিল মাসে তা অনেক বেড়ে যায়। পরে কিছুটা কমেছে, তবু স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রয়েছে (এতে উচ্চ পরিবহন ব্যয়সহ অন্যান্য খরচ ধরা হয়নি)। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে, স্বল্পমেয়াদি ঘাটতির আশঙ্কা আছে।

ব্যারেলপ্রতি ১৩০-১৫০ ডলার দামে কাঁচামাল কিনতে হওয়ায় ইউরোপের শোধনাগারগুলোর মুনাফা ঋণাত্মক হয়ে গেছে। ‘ব্যাকওয়ার্ডেশন’, অর্থাৎ বর্তমান দাম ভবিষ্যৎ দামের চেয়ে বেশি হওয়ার কারণে তাদের লাভ আরও কমে যাচ্ছে: এখন বেশি দামে তেল কিনে ভবিষ্যতে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে খুব শিগগির তাদের উৎপাদন কমাতে হতে পারে।

ইউরোপ যদি ভর্তুকি দিয়ে চাহিদা ধরে রাখে, বাজারের ভারসাম্য আরও বিঘ্নিত হবে। এতে পণ্যের দাম বাড়তেই থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণের সময় চাহিদা বাড়লে সেই চাপ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে ইউরোপ শীতের জন্য গ্যাস মজুত শুরু করলে এলএনজির জন্য প্রতিযোগিতা বাড়বে। এলএনজির ঘাটতিতে এশিয়াও পড়েছে, তারা এখন পর্যন্ত মূলত চাহিদা কমিয়ে এবং কয়লা ব্যবহার বৃদ্ধি করে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে।

দ্রুত কমতে থাকা মজুতের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ইউরোপে সাধারণত ৫০ দিনের মতো জেট ফুয়েলের মজুত থাকে। কিন্তু পরিসংখ্যানবিষয়ক প্রতিষ্ঠান কেপলারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জুনের মধ্যে হরমুজ স্বাভাবিক না হলে এই মজুত দ্রুত কমে যাবে। অন্যান্য আমদানিনির্ভর অঞ্চলে তা আরও দ্রুত শেষ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যদি অভ্যন্তরীণ দাম নিয়ন্ত্রণে চীনের মতো পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে, যুদ্ধ শুরুর পর তাদের রপ্তানি প্রায় অর্ধেক বেড়েছে।

সবকিছু সত্ত্বেও ফিউচার বাজার যেন বাস্তবতা অস্বীকার করছে। আজ হরমুজ পুরোপুরি খুলে গেলেও উপসাগরের উৎপাদন, পরিবহন ও শোধনাগার পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস লাগবে। বিশ্লেষকদের মতে, মোট ১৫০ কোটি ব্যারেল তেলের ঘাটতি-বৈশ্বিক বার্ষিক উৎপাদনের ৫ শতাংশ—প্রায় অনিবার্য। প্রণালি বন্ধ থাকলে এই ঘাটতি দ্বিগুণও হতে পারে।

শেষবার এত দ্রুত তেলের চাহিদা ১০ শতাংশের মতো কমেছিল ২০২০ সালের কোভিড-১৯ লকডাউনের সময়। সেবার বিশ্ব অর্থনীতি ৩ শতাংশের বেশি সংকুচিত হয়েছিল। দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, এবারও সে ধরনের ধাক্কা আসার শঙ্কা আছে, তা এড়ানোর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.