তুরস্ক: আর্মেনীয় জেনোসাইডের সত্য গোপনের আখ্যান

John Smith | আপডেট: ৫ মার্চ ২০২৬, ৯:১৩ সকাল

‘জেনোসাইড’ (গোষ্ঠীনিধন বা গণহত্যা) অস্বীকার কেবল কোনো ঐতিহাসিক অপরাধের সত্যকে এড়িয়ে যাওয়া বা নিছক ভুলে যাওয়ার বিষয় নয়। অস্বীকারকে মূলত সেই অপরাধেরই একটি চূড়ান্ত, সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘস্থায়ী পর্যায় হিসেবেই ভাবা হয়। যখন কোনো পরাক্রমশালী রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে পদ্ধতিগতভাবে নিশ্চিহ্ন করার পর সেই অপরাধের দায়ভার অস্বীকার করে, তখন সেটি ভুক্তভোগীদের স্মৃতি ও অস্তিত্বকে দ্বিতীয়বার হত্যার শামিল হয়

এই অস্বীকৃতির মূল লক্ষ্য হলো অপরাধীদের পরিচয় আড়াল করে তাদের কাঠামোগত ও আইনি দায়মুক্তি দেওয়া। অটোমান শাসনামলে আর্মিনীয় হত্যাযজ্ঞকে জেনোসাইড বলে মেনে নেয়নি তুরস্ক। ‘গণহত্যা অস্বীকারের বৈশ্বিক রাজনীতি’ শীর্ষক এই সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব এই বিষয় নিয়ে। ‘আজ আর্মেনীয়দের নিশ্চিহ্ন হওয়ার কথা কে আর মনে রেখেছে?’ ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে নাৎসি জার্মানির একনায়ক অ্যাডলফ হিটলার এই নিষ্ঠুর উক্তি করেছিলেন। পোল্যান্ড আক্রমণের প্রাক্কালে সাধারণ মানুষকে হত্যার নির্দেশ দিতে গিয়ে তিনি ১৯১৫ সালের আর্মেনীয় জেনোসাইডের উদাহরণ টানেন। জেনোসাইড বা গণহত্যা নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁরা বলেন যে যেকোনো গণহত্যার সর্বশেষ ও সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ধাপটি হলো একে ‘অস্বীকার’ করা। যখন কোনো জেনোসাইডকে অস্বীকার করা হয় এবং অপরাধীরা বিচারহীনতার সুযোগ পায়, তখন তা কীভাবে পরবর্তী যুগে নতুন স্বৈরশাসকদের উৎসাহিত করে, হিটলারের এই উক্তি তারই একটি ঐতিহাসিক প্রমাণমাত্র।

আর্মেনীয় জেনোসাইড সংঘটিত হয়েছিল ১৯১৫ থেকে ১৯২৩ সালের মধ্যে অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনামলে, বিশেষ করে ‘ইয়াং টার্কস’ (তরুণ তুর্কি) বা কট্টর জাতীয়তাবাদী সরকারের অধীনে। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই জেনোসাইড চালানো হয়। এই ৮ বছরের মধ্যে অটোমান সাম্রাজ্যের মানচিত্র থেকে ৩০ লক্ষের বেশি খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলা হয় বা সিরীয় মরুভূমিতে নির্বাসিত করা হয়।

এদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল আর্মেনীয়রা এবং তাদের পাশাপাশি আসিরীয় ও গ্রিক সম্প্রদায়ের মানুষও এই ভয়াবহ নৃশংসতার শিকার হয়। এই জেনোসাইড হঠাৎ করে ঘটা কোনো দাঙ্গা ছিল না, বরং এর পেছনে দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা কাজ করেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে শুরু হওয়া প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে অটোমান রাষ্ট্র ভালোভাবেই জনসংখ্যার তথ্য সংগ্রহ করেছিল, যা পরে সংখ্যালঘু নিধনে কাজে আসে।

আর্মেনীয় জেনোসাইড নিয়ে লেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বইয়ের মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হেনরি মরগেনথাউয়ের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ ‘অ্যাম্বাসেডর মরগেনথাউস স্টোরি’, যেখানে অটোমান সরকারের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সরাসরি প্রমাণ রয়েছে। ঐতিহাসিক দলিলের পাশাপাশি তুর্কি ইতিহাসবিদ তানের আকচামের লেখা ‘আ শেইমফুল অ্যাক্ট’ বইটি অত্যন্ত সাহসী একটি কাজ। কারণ, তিনি প্রথম তুর্কি গবেষক হিসেবে অটোমান আর্কাইভ ঘেঁটে এই গণহত্যার রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততা প্রমাণ করেন।

অন্যদিকে এই গণহত্যার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রতিক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে পিটার বালাকিয়ান লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত গবেষণাধর্মী বই ‘দ্য বার্নিং টাইগ্রিস’। এ ছাড়া ঐতিহাসিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে লেখা ফ্রাঞ্জ ভেরফেলের সাড়াজাগানো উপন্যাস ‘দ্য ফোরটি ডেজ অব মুসা দাগ’ বিশ্ববাসীর কাছে মুসা দাগ পাহাড়ে আর্মেনীয়দের ৪০ দিনব্যাপী বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের মর্মান্তিক চিত্র গভীরভাবে তুলে ধরেছে।

সাম্প্রতিককালে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত উমিত কুর্তের লেখা ‘দ্য আর্মেনিয়ানস অব আইনতাব: দ্য ইকোনমিকস অব জেনোসাইড ইন অ্যান অটোমান প্রভিন্স’ বইটিতে অটোমান সাম্রাজ্যের আইনতাব অঞ্চলে ঘটা আর্মেনীয় গণহত্যার পেছনের আসল অর্থনৈতিক কারণগুলো তুলে ধরা হয়েছে। লেখক স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে আর্মেনীয়দের ওপর যে ভয়াবহ অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল, তা শুধু তাদের মেরে ফেলার জন্য বা নিছক জাতিগত বিদ্বেষ থেকে হয়নি। এর পেছনে সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য ছিল তাদের বাড়িঘর, দোকানপাট, ব্যবসা এবং সমস্ত সম্পত্তি চিরতরে দখল করে নেওয়া।

অবাক করার বিষয় হলো, সাধারণ স্থানীয় মানুষ ও নেতারা খুব আগ্রহের সঙ্গে এই ধ্বংসযজ্ঞে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের মূল লোভই ছিল আর্মেনীয়দের ফেলে যাওয়া বিপুল ধনসম্পদ ও জায়গাজমি নিজেদের করে নেওয়া। তৎকালীন সরকারও নানা আইনের মারপ্যাঁচে (যাকে তারা ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি আইন’ বলত) এই বিশাল লুটপাটকে আইনি বৈধতা দিয়েছিল। যুগের পর যুগ ধরে আর্মেনীয়দের জমানো সম্পদ জোর করে কেড়ে নেওয়া হয় এবং সেই লুট করা সম্পদের ওপর ভর করেই তুরস্কে নতুন এক ধনী গোষ্ঠীর জন্ম হয়। সহজ কথায়, এই বই প্রমাণ করে যে আর্মেনীয়দের তাড়িয়ে তাদের সহায়-সম্বল লুট করাই ছিল এই গণহত্যার একটি প্রধান কারণ এবং এই চুরি করা সম্পদের ওপর ভিত্তি করেই ওই অঞ্চলের আধুনিক অর্থনীতি ও পুঁজিপতি শ্রেণির বিকাশ ঘটেছে।

জেনোসাইড অস্বীকার করার প্রক্রিয়াটি কিন্তু হত্যাকাণ্ড শেষ হওয়ার পরে শুরু হয়নি, বরং এটি হত্যার মূল পরিকল্পনার সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিল। অপরাধীরা এই দৃঢ় বিশ্বাস থেকেই এমন ভয়াবহ অপরাধে লিপ্ত হয় যে এর জন্য তাদের কোনো আইনি পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে না। অস্বীকারের একটি বড় প্রমাণ হলো ১৯১৬ সালে অটোমান সরকার কর্তৃক প্রকাশিত একটি প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণামূলক বই। বইটির নাম হলো ‘Ermeni Komitelerinin Amaal ve Harekat-htilaliyesi’ (যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়: '‘আর্মেনীয় কমিটিগুলোর লক্ষ্য ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ড’। এই বইয়ে খুব সুকৌশলে অপরাধী এবং অপরাধের শিকার যারা, তাদের অদলবদল করে দাবি করা হয় যে অটোমান রাষ্ট্র অত্যন্ত সহনশীল ছিল এবং উল্টো আর্মেনীয়রাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করেছিল।

রাষ্ট্র কীভাবে মিথ্যা প্রমাণ তৈরি করে, তার একটি চমৎকার উদাহরণ হলো আরাম দিলদিলিয়ান নামক একজন আর্মেনীয় ফটোগ্রাফারের ঘটনা। দিলদিলিয়ানকে জোরপূর্বক সাজানো অস্ত্রের ছবি তুলতে বাধ্য করা হয়েছিল। মারজোবান শহরে তাঁকে একটি কফিনের ছবি তুলতে বলা হয়, যেটিতে কোনো মরিচাবিহীন নতুন অস্ত্রশস্ত্র সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বকে দেখানো যে আর্মেনীয়রা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

দিলদিলিয়ানের স্মৃতিকথা অনুযায়ী, এ ঘটনা ঘটেছিল ১৯১৫ সালের ১৮ জুন। অর্থাৎ, সেই অঞ্চলে আসল নির্বাসন ও হত্যাকাণ্ড শুরু হওয়ার আগেই রাষ্ট্র নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের জন্য মিথ্যার জাল বুনছিল। জেনোসাইডের পরও ১৯৪০-এর দশকে তুরস্কের প্রদেশগুলোতে অবশিষ্ট আর্মেনীয়দের ওপর অবর্ণনীয় বৈষম্যমূলক কর ও নিপীড়ন চালানো হয়। প্রদেশগুলোতে টিকে থাকা এই আর্মেনীয়দের ‘চিরস্থায়ী নির্বাসিত’ বলা হতো, যারা পরবর্তীতে টিকতে না পেরে নিজেদের আসল পরিচয় গোপন করে ইস্তাম্বুলের মতো বড় শহরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে এই অস্বীকারের রাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় একাডেমিক গবেষণায় ঢুকে পড়ে এবং একধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক সহিংসতার জন্ম দেয়। জেনোসাইড অস্বীকার এবং এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে জোরালো কাজ করেছেন মার্ক্সবাদী ইতিহাসবিদ হ্যারি ডি হারোতুনিয়ান। তিনি একাডেমিকজগতের তীব্র সমালোচনা করে দেখিয়েছেন যে পশ্চিমা উপনিবেশবাদ নিয়ে অনেকে সরব থাকলেও অটোমান বা জারশাসিত সাম্রাজ্যগুলোর মতো ঐতিহাসিক সাম্রাজ্যগুলোর গণহত্যামূলক আগ্রাসনকে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়।

তাঁর মতে, উত্তর-উপনিবেশবাদে প্রভাবিত এই তাত্ত্বিকেরা সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পরিচয় নিয়ে অনেক কথা বলেন, কিন্তু তাঁরা এই রূঢ় বাস্তবতাটি ভুলে যান যে অটোমান সাম্রাজ্যে আর্মেনীয়দের কেবল শাসনই করা হয়নি, বরং তাদের স্রেফ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। হারোতুনিয়ান যুক্তি দেন যে রাষ্ট্রীয় অস্বীকারের কারণে ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতাগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ‘না-বলা স্মৃতি’ হিসেবে রয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় বইপত্র যখন সুকৌশলে সত্যকে মুছে ফেলে, তখন সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি, ডায়েরি এবং মুখে মুখে প্রচলিত গল্পের মধ্য দিয়েই প্রকৃত ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। যাদের জীবন রাষ্ট্রীয় খাতায় হিসাব করা হয়নি, তাদের সেই ‘অহিসাবকৃত জীবন’–এর গল্পগুলোই ইতিহাসের আসল সাক্ষী।

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.