হোম লোন নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা, যেগুলো জানা জরুরি

আহমেদ ফারুক | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫:৩৭ বিকাল

নিজের একটি বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার পরিকল্পনা করছেন। কয়েক বছর ধরে সঞ্চয় করেছেন, পছন্দের একটি প্রকল্পও হয়তো দেখে রেখেছেন। এবার ভাবছেন, বাকিটা হোম লোনে হয়ে যাবে। কিন্তু ব্যাংকে যাওয়ার আগেই চারপাশ থেকে আসতে শুরু করল নানা পরামর্শ। কেউ বললেন, ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা হাতে না থাকলে হোম লোনের কথা ভাববেন না। কেউ বললেন, একবার ঋণ নিলে সারা জীবন কিস্তি দিতেই হবে। আবার কেউ মনে করিয়ে দিলেন—

সিআইবি রিপোর্টে সামান্য সমস্যা থাকলেও ঋণ পাওয়া যায় না…ইত্যাদি।

এমন ধারণার কিছু কিছু সত্য হলেও বেশির ভাগই ভুল। ফলে অনেকেই প্রয়োজনের সময়ও হোম লোন নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে যান, আবার কেউ কেউ পর্যাপ্ত তথ্য না জেনেই এমন আর্থিক দায় নেন, যা পরে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।

বাস্তবে হোম লোন শুধু একটি ‘ঋণ’ নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার অংশ। তাই ইএমআই, ডাউন পেমেন্ট, এলটিভি, সিআইবি, সুদের হার কিংবা ঋণের মেয়াদ—এসব বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হয়।

ইএমআই: শুধু মাসিক কিস্তি নয়, মাসিক বাজেটেরও অংশ
হোম লোনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে পরিচিত শব্দগুলোর একটি হলো ইকুয়েটেড মান্থলি ইনস্টলমেন্ট বা ‘ইএমআই’। সহজভাবে বললে, ঋণের মূল অর্থ ও মুনাফা মিলিয়ে প্রতি মাসে যে নির্দিষ্ট কিস্তি পরিশোধ করা হয়, সেটিই ইএমআই।

অনেকেই মনে করেন, যত কম ইএমআই হবে, ততই ভালো। বিষয়টি সব সময় এতটা সরল নয়। মাসিক কিস্তি কমাতে ঋণের মেয়াদ দীর্ঘ করলে পুরো সময় শেষে মোট সুদের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। আবার ঋণের মেয়াদ কম হলে কিস্তির চাপ বাড়ে। তাই নিজের আয়, নিয়মিত ব্যয় এবং ভবিষ্যতের আর্থিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইএমআই নির্ধারণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ডাউন পেমেন্ট: সব সঞ্চয় একসঙ্গে খরচ করার প্রয়োজন নেই
হোম লোন নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো—বাড়ি কিনতে হলে সম্পত্তির অর্ধেক মূল্য আগে থেকেই হাতে থাকতে হবে। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গৃহঋণ নীতিমালায় ঋণ ও নিজস্ব অর্থের অনুপাত সর্বোচ্চ ৭০:৩০ নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংক সাধারণভাবে সম্পত্তির মূল্যের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থায়ন করতে পারে। বাকি অন্তত ৩০ শতাংশ অর্থ গ্রাহককে নিজস্ব উৎস থেকে দিতে হয়।

তবে এই ৩০ শতাংশ জোগাড় করতে গিয়ে নিজের সব সঞ্চয় ব্যয় করে ফেলাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ, বাড়ি কেনার পর নিবন্ধন, ফিট-আউট, স্থানান্তর কিংবা জরুরি প্রয়োজনের জন্যও কিছু অর্থ সংরক্ষণ করা জরুরি।

লোন টু ভ্যালু রেশিও (এলটিভি): ব্যাংক কতটা ঝুঁকি নেবে?
ধরুন, আপনি ৮০ লাখ টাকা দামের একটি ফ্ল্যাট কিনতে চান। অনেকের ধারণা, পুরো অর্থই ব্যাংক ঋণ হিসেবে দেবে। বাস্তবে ব্যাংক সম্পত্তির মূল্য, গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা বিবেচনা করে ঋণের পরিমাণ নির্ধারণ করে।

বর্তমান নীতিমালায় ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৭০:৩০ ঋণ-ইকুইটি অনুপাত অনুসরণ করে। অর্থাৎ সম্পত্তির মূল্যের একটি অংশ গ্রাহকের নিজেরই বিনিয়োগ করতে হয়। এতে ঋণগ্রহীতার নিজস্ব অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় এবং ঋণের ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে কমে।

সিআইবি: ঋণ নেওয়া নয়, ঋণ পরিশোধের অভ্যাসটাই গুরুত্বপূর্ণ
সিআইবি নিয়ে অনেকের মধ্যে অকারণ ভয় কাজ করে। অনেকেই মনে করেন, আগে কোনো ব্যাংকঋণ নিলেই ভবিষ্যতে নতুন ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।

মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) একজন গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের ইতিহাস সংরক্ষণ করে। সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করলে সেটি ইতিবাচক রেকর্ড হিসেবেই বিবেচিত হয়। তবে ঋণখেলাপি হওয়া বা দীর্ঘদিন কিস্তি বকেয়া থাকলে নতুন ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সেটি প্রভাব ফেলতে পারে।

এসব বিষয়ে প্রাইম ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম নাজিম এ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, নতুন গ্রাহকদের জন্য হোম লোনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের আয়, মাসিক কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা, সুদের হার, ঋণের মেয়াদ এবং মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা। তিনি আরও বলেন, অনেকেই শুধু সুদের হার বা ঋণের পরিমাণ দেখেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মাসিক কিস্তি ও অন্যান্য খরচও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রাইম ব্যাংকের হোম লোনে গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি নির্মাণের জন্য বিভিন্ন ধরনের ঋণসুবিধা রয়েছে, যার মেয়াদ সর্বোচ্চ ২৫ বছর পর্যন্ত।

এম নাজিম এ চৌধুরী বলেন, ‘হোম লোন নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো এটি মানেই অতিরিক্ত আর্থিক চাপ ও জটিল প্রক্রিয়া। আমরা গ্রাহকদের সঠিক তথ্য ও প্রয়োজনীয় পরামর্শের মাধ্যমে তাঁদের উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করি। প্রাইম ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো গ্রাহকদের আর্থিক জ্ঞান বাড়িয়ে তাঁদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম করে তোলা।’

হোম লোন দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার অংশ। তাই নিজের আর্থিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো আগে থেকেই বুঝে নিতে পারলে হোম লোন নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা কমে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হয়।

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.