ভূতের গল্পের ভক্ত মাইসার হাতে রকিব হাসানের ‘হাতকাটা ভূত’

আহমেদ ফারুক | আপডেট: ৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩:২৫ দুপুর

গা–ছমছমে ভূতের গল্প পছন্দ চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মাইসার। এ জন্য একনজর দেখেই সে রকিব হাসানের ‘হাতকাটা ভূত’ বইটা কিনে নিয়েছে। কেনার আগে অবশ্য এক সহপাঠী বান্ধবীকেও ডেকে এনেছে। উল্টেপাল্টে দেখিয়েছে। এরপর বইটা প্যাকেটবন্দী করে নিজের হস্তগত করেছে।

মাইসা বলল, রকিব হাসান তার প্রিয় গল্পকার। ‘হাতকাটা ভূত’ এক পিয়ানো টিচারকে নিয়ে লেখা বলে সে জেনেছে আগেই। ওই টিচারের মিউজিক স্কুলে যারা বাজনা শিখতে যায়, তারা নাকি আর কোনো দিন ফিরে আসে না। এ নিয়েই গল্প। বাকিটুকু বাসায় গিয়ে পড়বে।

আজ সোমবার সকালে চট্টগ্রামের বালুছড়ায় লিডার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রথমা আয়োজিত বই উৎসবে কথা হয় মাইসার সঙ্গে। বিদ্যালয়ে তখন ক্লাস শেষে টিফিনের বিরতি। এই ফাঁকে মাইসা এসেছিল বই দেখতে। কেবল মাইসা নয়, পুরো স্কুলই যেন ভেঙে পড়েছিল বই উৎসবের প্রাঙ্গণে। শিশুরা ক্যানটিনের দিকে না গিয়ে ছুটে আসে বইয়ের স্টলের দিকে। কেউ কিশোর উপন্যাস, কেউ রহস্যের বইয়ের মধ্যে হারিয়ে যায়। কারও হাতে কমিকস, আবার কারও হাতে দেখা গেল পছন্দের লেখকের গল্পের বই।

কেউ বইয়ের মলাট দেখে বই কিনছিল ঝটপট। আবার কেউ কেনার আগে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনার পর ঠিক করে নিচ্ছিল। ছোটদের মধ্যে কমিকস ও গল্পের বইয়ের প্রতি আগ্রহ যেমন দেখা গেছে, তেমনি বড় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অনেকেই কিশোর উপন্যাস ও রহস্যের বই খুঁজছিল।

মেলা প্রাঙ্গণে দেখা গেল একটি স্টল। বিজ্ঞান, গণিত, কিশোর উপন্যাস, গল্প, রহস্যসহ নানা ধরনের বই সাজিয়ে রাখা হয়েছে সেখানে। পাশাপাশি রয়েছে কিশোর আলো ও বিজ্ঞানচিন্তা। স্টলে এসে শিক্ষার্থীদের প্রথম প্রশ্ন, কোন বইয়ের দাম কত? কেউ আবার হাতে থাকা টাকা গুনে দেখছে। পছন্দের বইটি কেনার পর হাতে কত টাকা থাকবে, সেটিও মিলিয়ে নিচ্ছিল তারা।

মেলার আরেক প্রান্তে তখন গণিতের বই নিয়ে ব্যস্ত পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিদ ও আবির। দুজন মিলে আলোচনা করছিল, গণিতের কোন বইটি তাদের জন্য বেশি কাজে লাগবে। তাদের লক্ষ্য কঠিন গণিতের প্রশ্নগুলো সহজভাবে বোঝা। গল্প-উপন্যাসের বইও দেখছিল তারা। তবে বিজ্ঞান ও গণিতের বইয়ের প্রতিই তাদের আগ্রহ বেশি। এরই মধ্যে দুজনে মিলে বিজ্ঞানচিন্তার চলতি সংখ্যার দুটি কপি কিনে ফেলেছে।

টিফিনের বিরতি শেষ হলে ছোট শিক্ষার্থীরা ফিরে যায় শ্রেণিকক্ষে। কিছুক্ষণ পর শুরু হয় বড়দের টিফিনের বিরতি। আবারও শিক্ষার্থীদের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে বইয়ের স্টল। এবার মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বেশি দেখা যায় উপন্যাস ও গল্পের বইয়ে। কেউ থ্রিলার বা রহস্যের বই খুঁজছে, কেউ আবার স্টলে এসে প্রিয় লেখকের নাম বলে জানতে চাইছে, তাঁর কোনো বই আছে কি না।

নিম্নমাধ্যমিকের ছুটির সময় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আসতে শুরু করেন অভিভাবকেরাও। সন্তানের পছন্দের বই খুঁজে দিতে তাঁরাও ভিড় করছিলেন স্টলে। কেউ সন্তানের হাতে পছন্দের বই তুলে দিচ্ছিলেন, কেউ আবার বই বেছে নিতে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। সন্তানের বই পড়ার আগ্রহ দেখে অনেক অভিভাবকই নিজেদের পছন্দের বইয়ের পাশাপাশি শিশুদের উপযোগী বইও কিনছেন।

মেয়েকে নিতে এসে স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তানজিবা হাসান। বিশ্বজিৎ চৌধুরীর ‘ফুটো’ বইটি হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ পাতা উল্টেপাল্টে দেখেন তিনি। বিশ্বজিৎ চৌধুরীর লেখা আগে পড়েছেন তিনি। এবার মেয়ের জন্য বই খুঁজতে এসে নিজের পছন্দের কয়েকটি বইও চোখে পড়ে তাঁর। সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি কেনার কথাও ভাবছেন তিনি।

লিডার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ জানায়, শিক্ষার্থীদের বই পড়ায় উদ্বুদ্ধ করা এবং ছোটদের বিভিন্ন ধরনের বইয়ের সঙ্গে পরিচিত করতেই প্রথমা প্রকাশনের সঙ্গে যৌথভাবে এ বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, বিজ্ঞান, রহস্যসহ নানা ধরনের বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাদের আগ্রহী করে তুলতে এ আয়োজন।

লিডার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কর্নেল (অব.) আবু নাসের মো. তোহা বলেন, বই মানুষকে ন্যায়-অন্যায় ও ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে শেখায়। জ্ঞান অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস বই। বই শুধু বর্তমানের কথা বলে না, এর মাধ্যমে অতীতকে জানা যায় এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাও সম্ভব হয়। এভাবেই জ্ঞান ও চিন্তার বিকাশের মাধ্যমে সভ্যতা সামনে এগিয়ে যায়।

অধ্যক্ষ আরও বলেন, লিডার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের লক্ষ্য ভালো মানুষ তৈরি করা। এ জন্য জ্ঞান, নৈতিকতা ও দক্ষতা—এ তিন বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আর এই তিনেরই অন্যতম উৎস বই। তাই শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বই পড়ায় অভ্যস্ত করতে বিদ্যালয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রথমা প্রকাশনের এ ধরনের বইমেলা শিক্ষার্থীদের উপকার করবে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।

 

 

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.