তবে বছরখানেকের মধ্যে ওই মামলা থেকে অব্যাহতি পান ফখর উদ্দিন আহমেদ। একই সঙ্গে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে ময়মনসিংহ-১১ আসন (ভালুকা উপজেলা) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
এখন তিনি ভালুকা উপজেলা বিএনপিরও আহ্বায়ক। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর নতুন করে দলীয় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হামলা–মামলা ও ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নাম আসছে ফখর উদ্দিনের।
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে নানা ধরনের অনৈতিক অপতৎপরতায় লিপ্ত থাকার অভিযোগে সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিনকে কেন্দ্রীয় বিএনপির পক্ষ থেকে গত শনিবার (১৮ জুলাই) শোকজ বা কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সই করা ওই নোটিশে ফখর উদ্দিনের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ১৪ জুন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে এই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন ভালুকা উপজেলা ছাত্রদলের সদ্য সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক শরীফ হাসান। তিনি অভিযোগ করেন, সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিনের নির্দেশে ১৩ জুন উপজেলা ও পৌর ছাত্রদলের কর্মী সম্মেলনে অংশ নিতে গেলে তাঁদের ওপর হামলা চালান সংসদ সদস্যের অনুসারীরা।
প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া ওই অভিযোগে বলা হয়, সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ফখর উদ্দিন আহমেদ একক সাম্রাজ্য বিস্তার করতে চাইছেন। মতের অমিল হলেই বিগত দিনের পরীক্ষিত দলীয় নেতা-কর্মীদের ওপর বিভিন্নভাবে হামলা ও নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া দলীয় নেতা-কর্মীদের মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার ও হয়রানি করছেন তিনি।
সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা ছাত্রদলের নেতা শরীফ হাসান প্রথম আলোকে বলেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম করা যায় না। হামলার ভয়ে মন খুলে আড্ডা দেওয়া বা ঘোরাঘুরিও করা যাচ্ছে না।
এই সংসদ সদস্যের অনুসারীদের বিরুদ্ধে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে ৩ মার্চ পুলিশের ময়মনসিংহ রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন ভালুকার হবিরবাড়ি ইউনিয়ন যুবদলের কর্মী মো. মিজানুর রহমান। লিখিত অভিযোগে বলা হয়, হামলার ঘটনা ঘটলেও থানা কোনো মামলা নেয় না। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের প্রতি ভালুকার সাধারণ মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলছেন।
লিখিত ওই অভিযোগে মিজানুর উল্লেখ করেন, ১ মার্চ তাঁর বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এ ছাড়া ২৩ ফেব্রুয়ারি ভালুকা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক তিয়াস মাহমুদের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুরসহ কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
এ বিষয়ে তিয়াস মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিগত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর হয়ে কাজ করায় আমাদের ওপর হামলা করে সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিনের নিজস্ব বাহিনী। থানায় অভিযোগ নিয়ে গেলেও মামলা না নেওয়ায় ডিআইজির কাছে অভিযোগ দেওয়া হয়। সেখানে আমাদের ডাকা হলে আমরা লিখিত জবানবন্দি দিয়ে আসি। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের অভিযোগের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
ঝুট ব্যবসা নিয়ে বিরোধ
ময়মনসিংহের ভালুকা শিল্পাঞ্চলে শিল্প পুলিশের তালিকাভুক্ত কারখানা ১৫৫টি। এর মধ্যে বর্তমানে চালু আছে ১৪৫ কারখানা। বিভিন্ন ধরনের কারখানার অব্যবহৃত কাপড় ও সুতা আলাদাভাবে বিক্রি হয়, যা ‘ঝুট ব্যবসা’ নামে পরিচিত।
ভালুকা উপজেলা বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ভালুকার বেশির ভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ঝুট ব্যবসা উপজেলা বিএনপির তৎকালীন যুগ্ম আহ্বায়ক মুহাম্মদ মোর্শেদ আলমের লোকজনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। গত সংসদ নির্বাচনে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়ে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি। বিএনপির মনোনয়নে ফখর উদ্দিন আহমেদ সংসদ সদস্য হওয়ার পর তাঁর অনুসারীরা শিল্পকারখানাগুলোর ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চালান। এ নিয়ে দুই পক্ষে বিরোধ তৈরি হয়।
ভালুকার হবিরবাড়ি ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি শিল্পকারখানার অবস্থান। এই ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য এবং ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজাহান খান প্রথম আলোকে বলেন, আগে মোর্শেদ গ্রুপ ঝুট ব্যবসা পরিচালনা করলেও এখন সংসদ সদস্যের লোকজন ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এ নিয়ন্ত্রণ ও লাভের ভাগাভাগি নিয়েই দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে।
কারখানার ট্রাক ছিনতাই
দেশের শীর্ষস্থানীয় ডেনিম (জিনস) উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেডের কারখানা ভালুকায়। এই কারখানার পক্ষে ১১ জুলাই নিরাপত্তা চেয়ে ভালুকার শিল্প পুলিশের কাছে আবেদন করা হয়।
এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেডের প্রশাসন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক মো. সারোয়ার হোসেনের করা ওই আবেদনে বলা হয়, ৯ জুলাই দুপুরে এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেডের ব্যবহৃত রাসায়নিকের খালি ড্রাম বহনকারী ট্রাক কারখানার প্রধান ফটকের সামনে থেকে জোর করে ছিনতাই করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ঘটনার পরপরই সরকারি সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করা হয়। ওই দিন রাত নয়টার দিকে ট্রাকটি উদ্ধার করে শিল্প পুলিশ। পরে জানা যায়, ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক মো. ইব্রাহিম খলিল, স্বেচ্ছাসেবক দলের ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা মো. সোহাগ মিয়াসহ কয়েকজন ট্রাক ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। তাঁরা কারখানা থেকে ঝুট বের না করার জন্য প্রকাশ্যে হুমকি দেন। এ ছাড়া তাঁরা এনভয় টেক্সটাইলসের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বালু, খোয়াসহ বিভিন্ন সামগ্রী কারখানায় প্রবেশে বাধা দিয়ে আসছেন। ফলে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে গেছে।
ভালুকা উপজেলা বিএনপির একাধিক নেতা প্রথম আলোকে জানান, ইব্রাহিম খলিল ও সোহাগ মিয়া স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুসারী।
এনভয় টেক্সটাইলসের ট্রাক আটকে রাখার ঘটনাটি স্বীকার করে ভালুকা শিল্প পুলিশের বর্তমান পুলিশ সুপার মো. আনছার উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, প্রথমে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাতে সমাধান হয়নি। পরে তাঁরা শিল্প পুলিশের সহযোগিতা চান। অভিযোগে যাঁদের নাম এসেছিল, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর সন্ধ্যার মধ্যে ট্রাক অক্ষত অবস্থায় ফেরত দেওয়া হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা মালামাল বুঝে পেয়েছে এবং মামলা করতে আগ্রহী নয়।
‘ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা’
স্থানীয় বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে বহিষ্কৃত মোর্শেদ আলম প্রায় ২২ বছর ধরে ভালুকার জামিরদিয়া এলাকায় এসকিউ গ্রুপের কালার মাস্টার কারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঝুটের ব্যবসা করে আসছিলেন। ৪ জুলাই ওই কারখানা থেকে ঝুটের মালামাল বের করতে গিয়েছিল তাঁর মালিকানাধীন এইচআরকেএম এন্টারপ্রাইজ। তখন সংসদ সদস্যের অনুসারীরা তাদের বাধা দেয়। এতে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
মোর্শেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত সংসদ নির্বাচনের পর থেকে স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশে তাঁর পোষ্য লোকজন আমার ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা দিয়ে আসছেন। সংসদ সদস্যের নির্দেশে দুটি মিথ্যা মামলায় আমাকে আসামি করা হয়েছে। আমার নেতা-কর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে, তাঁদের মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে এলাকা ছাড়া করা হয়েছে।’
‘আমার কোনো লোক নেই’
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘নির্বাচনের সময়ও আমি দলের কোনো পদে ছিলাম না। আমার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। ময়মনসিংহ জেলায় আমি সর্বোচ্চ ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছি। এখানে আমার বলতে কোনো লোক নেই। আমার ভাই–ব্রাদার, আত্মীয়স্বজন কেউ যেহেতু ব্যবসায় নেই, তাই আমার কোনো লোক নেই। এখানে যাঁরা বলছেন যে আমার লোক, এটা একটা দুষ্ট চক্রের ইন্ধন। যারা দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাসিস্টদের নিয়ে চলেছে, ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে যাদের ব্যবসা ছিল, তারা এখন বিএনপির নেতা-কর্মীদের দায়ী করার জন্য এসব প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে।’
গত শনিবার সংসদ সদস্যকে দেওয়া কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দিতে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় বিএনপি। নোটিশের জবাব দিয়েছেন বলে জানান সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন।
হামলা–মামলা ও কারখানা দখলের চেষ্টার মতো অভিযোগ বারবার কেন আসছে—এমন প্রশ্নের জবাবে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘কোনো কারখানার মালিক এখনো আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেননি। কোনো কারখানায় আমি কাউকে সরাসরি পাঠিয়েছি, নিজে গেছি বা আমার কোনো ভাই–ব্রাদার, আত্মীয়স্বজন গেছে, এটা কেউ বলতে পারবে না।’
দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর ফখর উদ্দিন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। পর দিনই তাঁর বিরুদ্ধে দলীয় সিদ্ধান্তে ভালুকা থানায় মামলা করেছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ (প্রিন্স)। তিনি এখন ময়মনসিংহ জেলা পরিষদেরও প্রশাসক।
সৈয়দ এমরান সালেহ গতকাল রাতে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, কোনো অনৈতিকতা কিংবা অবৈধভাবে কোনো কাজের ক্ষেত্রে দলের হাইকমান্ডের দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই কঠোর থাকবে।