ফ্যাসিবাদ-বিরোধিতার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩১ শিক্ষকের তালিকা তৈরি করে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি এবং সম্প্রতি সাত শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। সংগঠনটির দাবি, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত না করে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩ এর পরিপন্থী। আজ সোমবার সকালে পাঠানো এক বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক এই উদ্বেগ প্রকাশ করে।
শিক্ষকদের এই প্ল্যাটফর্ম বলেছে, ‘রাজনৈতিক মত প্রকাশ বা সমর্থন কোনো অপরাধ নয়। কেবল ভিন্ন মতাবলম্বী হওয়ায় সহকর্মীদের প্রতি এহেন প্রতিশোধমূলক আচরণ আমাদের কেবল ক্ষমতার দর্পে অন্ধ হওয়া আওয়ামী ফ্যাসীবাদী শিক্ষকদের কথাই মনে করিয়ে দেয়।’
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক মনে করে, জবাবদিহির প্রশ্নটিকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখা যাবে না। জুলাই অভ্যুত্থানের আগের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশ যে দলীয় লেজুড়বৃত্তি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন সেটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যারা শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসতায় প্ররোচনা, হলের নিপীড়নে প্রশ্রয় দিয়েছেন বা সহকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক অভিযোগ দায়ের করেছেন কিংবা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য আন্দোলনের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জুলাইয়ের অন্যতম অঙ্গীকার। তবে এই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে — প্রতিহিংসা কিংবা মতাদর্শিক শুদ্ধি-অভিযানের মধ্য দিয়ে নয়। শিক্ষক হিসেবে নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে যারা ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের সেই দায় এড়ানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়।
বিবৃতিতে একটি মৌলিক নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। প্ল্যাটফর্মটি বলছে, কোনো ব্যক্তিকে কেবল একটি মত পোষণ, প্রকাশ কিংবা সমর্থনের জন্য শাস্তি দেওয়া যায় না, যতক্ষণ না তিনি সেই মতকে সহিংস বা ক্ষতিকর বাস্তবতায় রূপ দিতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেন। কোনো অগ্রহণযোগ্য অবস্থান কারও প্রতি শ্রদ্ধা হ্রাস করতে পারে, কিন্তু যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া তা কারও জীবিকা কেড়ে নেওয়ার ভিত্তি হতে পারে না।
ঢালাও তালিকা প্রণয়ন, অভিযোগ প্রমাণের আগেই তা সংবাদমাধ্যমে প্রচার করে সামাজিক হেনস্তা, কিংবা ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সম্পাদিত সব নিয়োগের বিরুদ্ধে ঢালাও তদন্তের ঘোষণা ‘উইচ-হান্টিং’ সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় বলেও মনে করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। বিবৃতিতে তারা বলেছে, এ ধরনের প্রতিশোধমূলক আচরণ নতুন করে ভয়ের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনে এবং তা আমাদের সেই ক্ষমতান্ধ চর্চারই কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যার বিরুদ্ধে জুলাই দাঁড়িয়েছিল। চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি ৫টি দাবিও জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। সেগুলো হলো: ১. যেকোনো ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও লিখিত অভিযোগ নিশ্চিত করা; ২. প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত পরিচালনা করা; ৩. অভিযুক্ত প্রত্যেককে অভিযোগ সম্পর্কে যথাযথভাবে অবহিত করা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ প্রদান করা; ৪. প্রমাণের ভিত্তিতে এবং ১৯৭৩ সালের আদেশে নির্ধারিত স্তরবিন্যস্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা; ৫. কেবল রাজনৈতিক মত, পরিচয় বা তালিকার ভিত্তিতে গৃহীত সকল ঢালাও ব্যবস্থা অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা ও প্রত্যাহার করা।