রনি আর জোর করেননি। প্রিয় মানুষদের সিনেমা দেখার মতো রিস্কি জব আর দ্বিতীয়টা নাই। বের হওয়ার মুখে ক্যামেরা থাকবে, জিগ্যেস করবে, ছবিটা কেমন? আপনি তো আর রসিকতা করতে পারেন না, শেষ দৃশ্যটা খুব সুন্দর ছিল। ওই যে লেখা উঠল, সমাপ্ত...
রনি আমার একটা গল্প থেকে টিভি-চিত্র বানিয়েছিলেন। ‘জননী সাহসিনী’। ওইটা দেখে আমি রনির ব্যাপারে উচ্চ ধারণা পোষণ করতে শুরু করি। আর আমরা দুজন প্রথম আলোর অনেকগুলো প্রামাণ্যচিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, যেমন কলসিন্দুরের মেয়েদের নিয়ে বানানো ‘অদম্য মেয়েরা’। সবগুলোই ভালো হয়েছে বলে দাবি করা যায়।
‘দম’ কেমন হবে? খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম। কারণ, প্লট জানি। প্রথম আলোর এক ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত একটি সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। আফগানিস্তানে বাংলাদেশের একজন এনজিও কর্মী অপহরণের শিকার হন। তাঁর অপহৃত হওয়া, টিকে থাকা আর তাঁর মুক্তির কাহিনি। এই সিনেমা নিয়ে ভয় তিনটি।
১. দমবন্ধ কাহিনি। রিলিফ থাকবে না। দেখতে না কষ্ট হয়। আমি নিজে ক্লসটোফোবিক। লিফট ভয় পাই। ‘ওয়ান টুয়েন্টিসেভেন আওয়ার্স’ সিনেমা আরম্ভ করে পাঁচ মিনিট পর দেখা বন্ধ করেছি। গুহাতে অভিযাত্রীরা ওই ছবিতে আটকে পড়ে।
২. বাংলাদেশের বেশির ভাগ সিনেমার দৃশ্য, কস্টিউম, সেট, সংলাপ খেলনার মতো হয়। নিশো নিশোই থাকবেন, মোশাররফ করিম মোশাররফ করিমই, আপনি বুঝতে পারবেন, তাঁরা অভিনয় করছেন। আর তাঁদের সামনে ক্যামেরা আছে। পরিচালক আছেন। সামনে যা ঘটছে তা সিনেমা, জীবন নয়, বাস্তবতা তো নয়ই। রেদওয়ান রনি কি আমাদের মেকবিলিভ করাতে পারবেন যে এটা আফগানিস্তান? নিশো নয়, একজন বাংলাদেশি এনজিও কর্মী জিম্মি হয়ে আছেন?
৩ নম্বর ভয়টা আরও মারাত্মক। এটা না আবার ফেস্টিভ্যাল মুভি হয়ে যায়। পুরস্কার আসে, কিন্তু দর্শক আসে না।

এই সিনেমা দেখে এসে আপনাদের আমি বলতে পারি, এই তিনটা প্রশ্নেই রেদওয়ান রনি দশে দশ পাবেন। সিনেমা দেখতে কষ্ট হয় না, আপনি গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত কান্না-হাসি-মানবিক সহানুভূতিময় গল্প আপনাকে বুঁদ করে রাখে। আপনি দমবন্ধের অনুভূতি পাবেন না; বরং আফগানিস্তানের (যদিও শুটিং হয়েছে কাজাখস্তানে) বিস্তৃত মরুভূমি, পাহাড়, ঝরনা, ঘরবাড়ি দরদালান আপনার চোখকে এক অপরূপ আরাম দেবে। আপনার মনে পড়ে যেতে পারে সৈয়দ মুজতবা আলীর আবদুর রহমানের সেই সংলাপ, পানশির হলো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দেশ, ইনহাস্ত ওয়াতানাম, এই তো আমার জন্মভূমি। ‘দম’ সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে ভিজু৵য়ালি সুন্দর সিনেমা। এবং এই সিনেমায় আপনি বিশ্বসিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে ঘরে ফিরবেন। সিনেমাটোগ্রাফি ওয়ার্ল্ড ক্লাস।
এবং ৩ নম্বর শঙ্কা, এটা কি ফেস্টিভ্যাল মুভি? না। একেবারেই না। এটা দর্শকদের ছবি। মূলধারার ছবি। বিকল্পধারার নয়।
এই সিনেমার জন্য পাণ্ডুলিপি নিয়ে রনি এবং তাঁর টিম বছরের পর বছর কাজ করেছেন। সেটার সুফল তাঁরা পেয়েছেন।
কাহিনির মধ্যে অনেক উপকাহিনি, প্রধান চরিত্রের পাশাপাশি অনেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র এই ছবিকে মধুর করে তুলেছে। আফরান নিশো আমাদের প্রটাগনিস্ট, যিনি আটকা পড়বেন, যাঁর অমর সংলাপ, ‘আমি শাহজাহান ইসলাম নূর। বাংলাদেশি মুসলমান। মনে রাইখো।’ নিশো তো হিরো হতে চান না, অভিনেতা হতে চান, এটা যেকোনো পরিচালকের জন্য বিশাল সুবিধা। আরেকটা দারুণ চরিত্র রানি, পূজা চেরী অভিনয় করেছেন যে চরিত্রে। এ তো আরেক বেহুলা, আরেক আয়েশামঙ্গল, যে উজান স্রোতে ভেসে তার স্বামীকে উদ্ধার করে ছাড়ে। বাস্তবেও একজন এনজিও কর্মী নূরের স্ত্রী তাঁর স্বামীর মুক্তির জন্য মন্ত্রণালয়ের বারান্দায় বসে পড়েছিলেন।'পূজা চেরী কী যে সুন্দর অভিনয় করেছেন! আরেকটা দারুণ চরিত্র চঞ্চল চৌধুরীর। কাহিনি বলে দেব না। তবে রনির স্ক্রিপ্টরাইটার-বাহিনীকে ধন্যবাদ এই চরিত্রটা তৈরি করবার জন্য। যেমন হাডুডু খেলা দিয়ে শুরু, আর শেষ—এটা তাৎপর্যপূর্ণ। চঞ্চলের বস হাকিম সাহেবের চরিত্রের বাঁকবদলও দারুণ। দুইটা ছোট্ট আফগান বালিকা, উফ্, মর্মস্পর্শী তাদের গল্প। আর ওই আফগান যুবক রশীদ, যে কথা বলে কম; কিন্তু আগাগোড়া যার উপস্থিতি একটা প্রসন্নতা ছড়ায়—অস্ত্র কাঁধে এক আফগান তালেবানও যে স্নিগ্ধ হতে পারেন! আর প্রধান খল চরিত্র যাঁর, তাঁকে তো আফগান বলা যাচ্ছে না, তিনি কোন দেশি, বলে দিলে স্পয়লার হয়। সেটা বলব না। শুধু বলব, হল থেকে বেরোনোর পরে দর্শকেরা টিভি ক্যামেরাতে সাক্ষাৎকার দেন, তাঁদেরই একজন বলেছেন, দেশপ্রেম যে এভাবেও ফুটিয়ে তোলা যায়, এই ছবি তা দেখিয়ে দিয়েছে। তাই বলি, নতুন প্রজন্মের সবার উচিত সিনেমাটা দেখা। দেশকে আরেকটু ভালোবাসা যাবে এই ছবিটা দেখার পর।

ভোর হচ্ছে। আফগানিস্তানের পাহাড়ের ওপরে নিশো। সূর্য উঠছে। কিংবা পূজা আর নিশো একটা বালিশৃঙ্গের ওপরে। ওই বিপজ্জনক চূড়ায় ওরা উঠলেন কী করে? সে–ও তো আলাদা গল্প। ওদের শ্বাসকষ্ট হয়েছিল। কিংবা বাংলাদেশের অপরূপ দিগন্ত, শর্ষেখেত। রাজহাঁস দুটো ঠিক সময়ে পাখা মেলল কী করে? কিংবা গাধাগুলোই–বা এত ভালো অভিনয় করল কী করে?
গাধার পিঠে একজনকে তুলে দেওয়া হয়েছে। তালেবান জল্লাদের হাতে নাঙা তলোয়ার। গাধাটা যেই থামবে, অমনি তার কল্লা কাটা হবে। গাধা ঘুরছে। গাধা থামল। চলল তরবারি। মাথা লুটিয়ে পড়ল। বাংলাদেশি মুসলমান নূর সেই দৃশ্য দেখল। এবার তাকে তোলা হলো গাধার পিঠে। গাধা ঘুরছে। স্ত্রী বলেছিলেন, দোয়া ইউনুস পড়ো। নিশো বা নূর দোয়া ইউনুস পড়ছেন। তাঁর জন্য দোয়া করছেন তাঁর মা (ডলি জহুর।) তাঁর স্ত্রী (পূজা চেরী)। দোয়া করছি আমরা, দর্শকেরা। কী হবে এখন? এই গাধা আর কতক্ষণ টিকবে!

আর ওই দৃশ্যটা। নিশো আর তাঁর প্রধান শত্রু মারামারি করতে করতে পড়ে গেল পাহাড়ের খাদ থেকে নিচের স্রোতস্বিনীতে। শুটিং করলটা কেমনে?
ভেজা চোখ নিয়ে দর্শকেরা বের হন হল থেকে। ভালো লাগার অশ্রু। ভালোবাসার অশ্রু। দেশপ্রেমের আবেগের অশ্রু। এবং একটি ভালো ছবি দেখার অভিজ্ঞতার অনুভূতি।
রেদওয়ান রনি একটা কঠিন পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করলেন। আর বাংলাদেশ পেল একজন হিরোকে, যাঁর প্রধান সম্পদ অভিনয়ের সিনসিয়ারিটি। যাঁর আছে দর্শক আকর্ষণ করার বিশেষ জাদুকরি ক্ষমতা। তাঁর নাম আফরান নিশো।
‘দম’ বাংলাদেশি সিনেমাকে বিশ্বসিনেমার ক্লাসে উন্নীত করল। ‘দম’ বাংলা ছবির সীমানা বড় করল। ভালো না ব্যাপারটা!
