চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বেশি নগরে, ৭৩ শতাংশ মৃত্যুই চলতি সেপ্টেম্বর মাসে

আহমেদ ফারুক | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯:২৭ সকাল

চট্টগ্রাম বিভাগে চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে। বছরের প্রথম ৮ মাসে ৬ জনের মৃত্যু হলেও সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনেই মারা গেছেন ১৬ জন। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চট্টগ্রামের ১১ জেলায় চলতি বছর ডেঙ্গুতে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ বছরে মোট মৃত্যুর ৭৩ শতাংশই হয়েছে সেপ্টেম্বরে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে একজনের। জুনে মারা যান দুজন, জুলাইয়ে দুজন এবং আগস্টে একজন। এরপর সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনেই মৃত্যু বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ জনে। গত শুক্রবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে এর আগের দিন পর্যন্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এদিকে মৃত্যুর পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের ২৪ দিনে বিভাগে ৫ হাজার ৫৮০ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। আগস্টে রোগী ছিল ২ হাজার ৮৭৫ জন। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে রোগী বেড়েছে ২ হাজার ৭০৫ জন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলতি বছরে চট্টগ্রাম বিভাগে মোট ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ১৬৪ জন।

চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলের আশপাশে কোথাও যাতে পানি জমে না থাকে, সেদিকে সবাইকে নজর দিতে হবে। জ্বর বা ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

চট্টগ্রাম জেলায় আক্রান্ত বেড়েছে
গত শুক্রবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রামে চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৯৮৫ জন। এর মধ্যে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৩৬ জন। অর্থাৎ পুরো বছরে আক্রান্তের প্রায় অর্ধেক গত ২৫ দিনে। পুরো বছরে মৃত্যুর ৭৩ শতাংশও এই ২৫ দিনে। পুরো বছরে মারা যাওয়া ১৮ জনের মধ্যে ১৩ জনই মারা গেছেন সেপ্টেম্বর মাসে।

চিকিৎসক ও কীটতত্ত্ববিদেরা জানান, ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে নগরী, সীতাকুণ্ড ও কর্ণফুলী উপজেলার রোগী বেশি। চলতি মাসে চট্টগ্রামে থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পর প্রায় ২৫ দিন পর্যন্ত এডিস মশার প্রজনন ও ডেঙ্গুর সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। ফলে এমন আবহাওয়ায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জেলা ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, গত জুন মাসে চট্টগ্রাম নগরে জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এরপর সীতাকুণ্ড ও কর্ণফুলী উপজেলায় আক্রান্ত বাড়লে সেখানেও জরিপ চালানো হয়। দুই জরিপে প্রাপ্ত লার্ভার মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই ডেঙ্গুর প্রধান বাহক ‘এডিস ইজিপ্টাই’ এবং ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ‘এডিস অ্যালবোপিকটাস’ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

কীটতত্ত্ববিদেরা জানান, দেশে ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস ইজিপ্টাই। অন্যদিকে এডিস অ্যালবোপিকটাস ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়ার বাহক। কোনো এলাকায় এডিস ইজিপ্টাইয়ের লার্ভা বেশি পাওয়া গেলে সেখানে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। অন্যদিকে এডিস অ্যালবোপিকটাসের লার্ভা বেশি পাওয়া গেলে সেখানে ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়ারও ঝুঁকি থাকে।

prothomalo-bangla%2F2026-09-26%2Fqxv1nwx4%2FDengu-2.jpg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

আক্রান্ত বেশি নগরে, বাড়ছে উপজেলায়

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে চলতি বছর আক্রান্তের মধ্যে ১ হাজার ৮০৯ জন নগরের, ১ হাজার ৭২৯ জন ১৫ উপজেলার এবং ৪৪৭ জন অন্য জেলার বাসিন্দা। চলতি মাসে আক্রান্তদের মধ্যে একই চিত্র দেখা গেছে। চলতি মাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৯২৩ জন নগরের, ৮৫৭ জন উপজেলার এবং ১৬৯ জন অন্য জেলার বাসিন্দা।

গত শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৬৩ জন। এর মধ্যে ৩৪ জন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে আসছেন রোগীরা। রোগীদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দিন ধরে জ্বর, মাথাব্যথা ও শরীরব্যথার মতো উপসর্গ নিয়ে তাঁরা হাসপাতালে আসছেন।

উপজেলাগুলোর মধ্যে নগরসংলগ্ন সীতাকুণ্ড ও কর্ণফুলী উপজেলার বাসিন্দা বেশি। চলতি বছর সীতাকুণ্ড উপজেলায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৫১৬। এসব রোগীর অধিকাংশই উপজেলার কুমিরা, ভাটিয়ারী, সোনাইছড়ি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার। প্রাথমিকভাবে এ চার এলাকাকে ডেঙ্গুর জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, জ্বর হলে দেরি না করে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। রোগের শুরুতেই হাসপাতালে গেলে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়। ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা গেলে ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.