বাসে ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়তি ভাড়া আদায় হচ্ছে

আহমেদ ফারুক | আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪:২৩ দুপুর

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বাসের ভাড়া বাড়িয়েছে সরকার। তবে রাজধানীর বিভিন্ন পথে যাত্রীদের কাছ থেকে সরকার–নির্ধারিত ভাড়ার বেশি আদায় করা হচ্ছে। এ নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে বাসকর্মীদের বাগ্‌বিতণ্ডাও হচ্ছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর ঢাকা মহানগরে প্রতি কিলোমিটারে বাসের ভাড়া ১৭ পয়সা বাড়িয়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ, কাগজে–কলমে ভাড়া বেড়েছে ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ। যদিও বাস্তবে বাড়তি নেওয়া হচ্ছে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত। সেই হিসাবে ঢাকা মহানগরে প্রকৃত অর্থে ভাড়া বৃদ্ধির হার ২৫ থেকে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত।

গত রোববার দেশে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের মূল্য ২০ টাকা বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারি করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এরপর মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে বাসের ভাড়া বাড়ানোর কথা জানানো হয়। যদিও আগের দিন থেকেই বিভিন্ন পথে বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু হয়।

ভাড়া বৃদ্ধির পরদিন গতকাল বুধবার রাজধানীতে সরেজমিনে বিভিন্ন পথে বাসের যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় ধানমন্ডি ১৫ নম্বরের বাসস্ট্যান্ড থেকে রমজান পরিবহনের বাসে ওঠেন এই প্রতিবেদক। গন্তব্য গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট। এই সড়কের দূরত্ব ৬ কিলোমিটারের কাছাকাছি। ভাড়া বৃদ্ধির আগে এই দূরত্বে নেওয়া হতো ২০ টাকা। কিন্তু গতকাল ২৫ টাকা ভাড়া আদায় করছিলেন চালকের সহকারী।

দেখা যায়, যাত্রীদের অনেকে ধানমন্ডি থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত ২০ টাকার বেশি ভাড়া দিতে চাইছিলেন না। এটা নিয়ে ওই যাত্রীদের সঙ্গে চালকের সহকারী বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়াচ্ছিলেন। তবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভাড়া কিছুটা কম নেওয়া হচ্ছিল।

জানতে চাইলে রমজান পরিবহনের ওই বাসের চালকের সহকারী প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বিভিন্ন দূরত্বে বাসের ভাড়া ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ওই সহকারী আরও বলেন, ‘তেলের পাশাপাশি বাজারে সবকিছুর যে অতিরিক্ত দাম, তাতে আমাদের মতো মানুষের টিকে থাকাই কঠিন। আমাদের তা–ও কাজ আছে, কষ্ট করে কোনোরকমে পেট চালাইতে পারতেছি। অনেকের তো কাজও নেই, তাদের অবস্থা তো ভয়াবহ।’

ঢাকার ভাটারা এলাকার নতুনবাজার থেকে ভিক্টর পরিবহনের একটি বাসে গতকাল দুপুরে গুলিস্তানে এসেছিলেন সিরাজুল ইসলাম নামের একজন ব্যক্তি। তিনি জানান, সাধারণত ৩০ টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও তাঁর কাছ থেকে গতকাল নেওয়া হয়েছে ৪০ টাকা।

গুলিস্তানে আধঘণ্টা অবস্থানের পর পল্টন মোড় থেকে কারওয়ান বাজারে আসার জন্য ওয়েলকাম পরিবহনের বাসে ওঠেন এই প্রতিবেদক। সাধারণত এই দূরত্বের জন্য ভাড়া ১০ টাকা হলেও চালকের সহকারী চাইলেন ১৫ টাকা। ভাড়া নিয়ে বাসের মধ্যে কিছু যাত্রীর সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়াতে দেখা যায় সহকারীকে।

কারওয়ান বাজার মোড়ে এসে নামার পর রাস্তার পাশে কিছু যাত্রীকে অপেক্ষমাণ দেখা গেল। সেখানে জাহানারা বেগম নামের এক যাত্রী বললেন, ‘আজ (গতকাল) অনেক বাসে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।’

একাধিক যাত্রী জানান, মৌমিতা ও ঠিকানা পরিবহনেও গন্তব্য অনুযায়ী ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়তি নেওয়া হচ্ছে। মৌমিতার বাস চলে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া থেকে গাজীপুরের চন্দ্রা। আর ঠিকানার বাস চলে সাইনবোর্ড থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য, সরকার–নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে এক পয়সাও বেশি নেওয়া যাবে না। আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ বিভিন্নভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

বাড়তি ভাড়া আদায় আগেও ছিল

বিআরটিএর হিসাবে, ঢাকা শহরে অনুমোদিত বাসের সংখ্যা সাত হাজারের মতো। এসব বাস চলে ৩০০টির মতো কোম্পানির অধীন। মালিক আছেন অন্তত চার হাজার।

মালিকেরা কখনো সরাসরি শ্রমিকদের অথবা কোম্পানিকে দৈনিক লিখিত অথবা মৌখিক চুক্তিতে বাস ভাড়া দেন। এ ক্ষেত্রে আয় যতই হোক, মালিকেরা প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পান (সাড়ে চার হাজার টাকার মতো)। জ্বালানিসহ অন্যান্য খরচের পর যা থাকে, তা চালক ও ভাড়া আদায়কারী ভাগ করে নেন। আবার কখনো কোম্পানি শ্রমিক নিয়োগ করে বাস পরিচালনা করে। এ ক্ষেত্রে তাদের নির্দিষ্ট টাকা দেওয়া হয়, যা পথভেদে ভিন্ন। কখনো শ্রমিকেরা দৈনিক চুক্তিতে বাস ভাড়া করেন।

পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এমন পরিস্থিতি বাসকর্মীদের বাড়তি ভাড়া আদায়ের পথ তৈরি করে দেয়। পাশাপাশি নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিও তাদের জীবনযাপনে প্রভাব ফেলে। আবার শ্রমিকদের কল্যাণে যে তহবিল, সেটাও সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় না, শ্রমিকদের কাছে পৌঁছায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, বাস ভাড়া করে চালানোর বিষয়টি ব্যক্তিপর্যায়ে হয়ে থাকে। এখানে সমিতির কোনো হাত নেই। আর শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিল স্বচ্ছভাবে ব্যবস্থাপনায় নতুন আইন হয়েছে। আমরা সেটি সবাইকে মেনে চলার আহ্বান জানাই।

পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর যেভাবে বাসের ভাড়া বেড়েছে, এটি আসলে সব সময়ের বাস্তবতা। অতীতেও এই প্রবণতা দেখা গেছে। সরকারের যথাযথ নজরদারি না থাকায় অতিরিক্ত ভাড়ার চাপ পড়ে নিম্ন আয়ের বাসযাত্রীদের ওপর।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার যদি যাত্রীবাহী বাসের নাম এবং রেজিস্ট্রেশন নম্বর বাসের ভেতরে দৃশ্যমান জায়গায় টাঙানোর ব্যবস্থা করতে পারে, পাশাপাশি ভাড়ার তালিকা টাঙানো থাকে, তাহলে সাধারণ যাত্রীরা সুনির্দিষ্টভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করতে পারবেন। এভাবে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধ করা সম্ভব হবে।’

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.