যন্তর মন্তরের আন্দোলনকারীরা বললেন, এবার বাড়ি ফেরা, পরীক্ষার প্রস্তুতির পালা

আহমেদ ফারুক | আপডেট: ২৬ জুলাই ২০২৬, ১:১৯ দুপুর

নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনের একটি দৃশ্য। যন্তর মন্তর, নয়াদিল্লি, ভারত, ২৩ জুলাই

টানা ৩৬ দিন ধরে হাজারো শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবী ও বিক্ষোভকারীর ঠিকানা ছিল ভারতের নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর। গতকাল শনিবার ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো কেন্দ্রীয় সরকার মেনে নেওয়ার পর অবশেষে তাঁরা সবকিছু গুছিয়ে বাড়ির পথে রওনা হতে শুরু করেছেন।

যন্তর মন্তরে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ৩০ বছর বয়সী বিদ্যাভূষণ কুমার ইউপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ২০ জুলাই বিক্ষোভকারীদের ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি সহিংস রূপ নেওয়ার পর থেকে তিনি বিক্ষোভস্থলেই অবস্থান করছিলেন। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগে তাঁর বাড়ি ছেড়ে দূরে এসে রাস্তায় কাটানো সময় ও কষ্ট সার্থক হয়েছে।

বিহারের গয়ার বাসিন্দা বিদ্যাভূষণ সেখানে স্কুলশিক্ষার্থী ও ইউপিএসসি পরীক্ষার্থীদের পড়ান। সেই সঙ্গে তিনি ২০২৭ সালে ইউপিএসসি পরীক্ষায় শেষবারের মতো অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

গত ২০ জুন থেকে যন্তর মন্তরে মঞ্চের কাছের একটি তাঁবুতে রাত কাটিয়ে আসছিলেন বিদ্যাভূষণ। শৌচাগার ব্যবহারের জন্য তিনি দিনে একবার কাছের গুরুদুয়ারা বাংলা সাহিবে যেতেন।

বিদ্যাভূষণ বলেন, তিনি ২০১৭ ও ২০১৮ সালে দিল্লি থেকে ইউপিএসসি মেইনস পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে তাঁকে গয়ায় ফিরে যেতে হয়। যন্তর মন্তরে আসার উদ্দেশ্য ছিল সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা। যদি প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে থাকে, তাহলে সরকারের উচিত তা স্বীকার করা, দায় নেওয়া।

একটি সরকারি চাকরির জন্য কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছেন বিদ্যা ভূষণ। এ চেষ্টায় নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সম্প্রতি বিহারে সহকারী শিক্ষা উন্নয়ন কর্মকর্তা (এইডিও) পদে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁর পরীক্ষাকেন্দ্র ছিল আওরঙ্গবাদে। সেখানে যেতে নিজের কষ্টার্জিত অর্থ খরচ করেন। কিন্তু পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে তিনি জানতে পারেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় পরীক্ষাটি বাতিল করা হয়েছে।

যন্তর মন্তরে বিক্ষোভে আসার পর বিদ্যাভূষণ অনেকবারই বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন। তিনি বলেন, ‘কিন্তু ফিরে গিয়ে কী পেতাম? একটি ভেঙে পড়া শিক্ষাব্যবস্থা?’

যন্তর মন্তরে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে গয়ায় থাকা বন্ধুরা উপহাস করেছিল বলে জানান বিদ্যাভূষণ। তিনি বলেন, আজ তাঁরা বুঝতে পেরেছেন, কেন তিনি যন্তর মন্তরে অবস্থান করছিলেন।

বিদ্যাভূষণের পাশেই বসে ছিলেন উত্তর প্রদেশের বেরেলির ২০ বছর বয়সী নিট পরীক্ষার্থী দেবাশীষ। এ বছরই তিনি প্রথমবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই পরীক্ষা বাতিল হয়ে যায়। ২১ জুন আবার পরীক্ষা দেওয়ার পর তিনি ট্রেনে করে দিল্লি যান। তখন থেকে যন্তর মন্তরের বিক্ষোভস্থলে অবস্থান করেন।

দেবাশীষ বলেন, প্রথম পরীক্ষায় তাঁর প্রায় ৫৬০ নম্বর পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পুনঃপরীক্ষায় তিনি মাত্র ৪১০ নম্বর পেয়েছেন। তাঁর মা–বাবা তাঁকে বলেছেন, এখন যদি তাঁরা প্রতিবাদ না করেন, তাহলে তাঁদের কণ্ঠ চিরতরে চাপা পড়ে যাবে। আর সে কারণেই তিনি যন্তর মন্তরে আসেন।

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগে উচ্ছ্বসিত এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আজ আমাদের জয় হয়েছে।’

এবার দেবাশীষ বাড়ি ফিরে আবার নিট পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করবেন বলে জানান।

যন্তর মন্তরে শুধু প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পরীক্ষার্থীরাই আসেননি; সেখানে এমন অনেক মানুষও জড়ো হয়েছিলেন, যাঁরা কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিলেন না, যেমন ৭৬ বছর বয়সী অজিথা কে। তিনি তিন দিন আগে কোঝিকোড় থেকে যন্তর মন্তরে আসেন। তিনি বলেন, ‘এখানকার উদ্দীপনা অনুভব করতে আমি এখানে এসেছি।’

অজিথার ভাষ্য, বিপুল জনসমাগম ও প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও তিনি বিক্ষোভস্থলে অবস্থান করায় অনেক বিক্ষোভকারী থেমে তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

অন্যদিকে গুরগাঁওয়ের গৃহিণী মালিকা তাঁর ১১ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে যন্তর মন্তরে আসেন। তিনি বলেন, ‘আমি জেন-জি প্রজন্মকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। এই পদত্যাগ করতে এত সময় লেগেছে, এটা লজ্জার। আমি আমার ছেলে, যে জেন আলফা প্রজন্মের, তাকে নিয়ে এসেছি তার বড় ভাইবোনদের প্রতি সমর্থন জানাতে।’

এই নারী আরও বলেন, এ আন্দোলন কোনো সরকার বা রাজনৈতিক দল ঘিরে নয়, এটা জবাবদিহির প্রশ্ন। মানুষ ভুল করলে সেই ভুল স্বীকার করার মানসিকতা থাকতে হবে।

দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা মোহাম্মদ নাভেদ খান ২০ জুলাই পুলিশের অভিযানের কথা এখনো ভুলতে পারেননি। সংঘর্ষে আহত হয়ে তাঁর চারটি সেলাই লাগে। চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি আবার যন্তর মন্তরে ফিরে এসে বিক্ষোভের মঞ্চ পুনর্নির্মাণের কাজে হাত লাগান।

নাভেদ খান বলেন, ‘যে পুলিশ সদস্য আমাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করেছিলেন, তিনি মুখে মাস্ক পরেছিলেন। হাসপাতালে নেওয়ার দুই ঘণ্টা পরই আমি আবার এখানে ফিরে আসি।’

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.