রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা আজাদুল ইসলাম (ছদ্মনাম)। তিনি কারওয়ান বাজারের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। যাত্রাবাড়ী থেকে বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা রিকশায় আজাদুল মতিঝিল আসেন। মেট্রোরেলে করে যান কারওয়ান বাজার। ফিরতি পথে মেট্রোরেলে মতিঝিল যান। যাত্রাবাড়ী যেতে বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা রিকশা নেন।
বাসযাত্রায় ভিড়াভিড়ি–ঠেলাঠেলির ঝক্কিঝামেলার সঙ্গে পকেটমারের খপ্পরে পড়ার ঝুঁকি আছে। অন্যদিকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আছে ‘গলাকাটা’ ভাড়ার আতঙ্ক। সে তুলনায় অবশ্য রিকশার ভাড়া ‘খুব বেশি’ নয়। তবে ইদানীং রিকশাচালকেরাও ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে আজাদুলের প্রায়ই মনে হয়, রাইড শেয়ারিংয়ের ব্যক্তিগত গাড়ির পাশাপাশি সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা রিকশায় অন্য যাত্রীর সঙ্গে ভাগাভাগি করে চলতে পারলে মন্দ হতো না। তাহলে অন্তত ভাড়া ভাগাভাগির মাধ্যমে খরচের চাপ কমানো যেত।
ঢাকায় চলাচলের ক্ষেত্রে এমন অভিজ্ঞতা, ভাবনা আজাদুলের একার নয়। প্রায় একই সময়ে, একই গন্তব্যে অনেকেই চলাচল করেন। কিন্তু দেখা যায়, একক যাত্রী একটি শেয়ারিংয়ের ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা রিকশা নেন। ফলে বাকি আসন ফাঁকাই থাকে। আর ভাড়ার একক বোঝা তো আছেই।
এই সমস্যার একটি ‘স্মার্ট’ সমাধান নিয়ে এসেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী জোবায়ের খান, মুস্তাকিম মোরসেদ ও আবুল বাসার।
বুয়েটের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই তিন শিক্ষার্থী ভাবনা ছিল, একই সময়ে একই গন্তব্যে যাওয়া যাত্রীদের যদি কোনোভাবে একসঙ্গে করা যায়, তাহলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। এই ভাবনা থেকেই তাঁরা ‘জাইগো’ (JyGo) নামের একটি ‘ভেহিকেল-পুলিং’ অ্যাপ বানিয়েছেন।
তিন উদ্যোক্তা বলছেন, অ্যাপটির ধারণা খুবই সহজ। একই সময়ে, একই পথে বা গন্তব্যে যাতায়াত করতে চান—এমন যাত্রীদের এক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করে অ্যাপটি। এরপর তাঁরা একটি ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা রিকশায় ভাগাভাগি (শেয়ার) করে গন্তব্যে যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে যাত্রীদের মধ্যে ভাড়ার খরচ ভাগ হয়ে যাবে।
ধরা যাক, কারওয়ান বাজার থেকে যাত্রাবাড়ী যেতে সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশার ভাড়া ৪০০ টাকা। এখন ‘জাইগো’ অ্যাপের মাধ্যমে একত্র হওয়া তিন যাত্রী যদি এই অটোরিকশায় গন্তব্যে যান, তাহলে ভাড়ার টাকা তাঁদের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে।
ঢাকায় চলাচলের ক্ষেত্রে এমন অভিজ্ঞতা, ভাবনা আজাদুলের একার নয়। প্রায় একই সময়ে, একই গন্তব্যে অনেকেই চলাচল করেন। কিন্তু দেখা যায়, একক যাত্রী একটি শেয়ারিংয়ের ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা রিকশা নেন। ফলে বাকি আসন ফাঁকাই থাকে। আর ভাড়ার একক বোঝা তো আছেই।
এই সমস্যার একটি ‘স্মার্ট’ সমাধান নিয়ে এসেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী জোবায়ের খান, মুস্তাকিম মোরসেদ ও আবুল বাসার।
বুয়েটের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই তিন শিক্ষার্থী ভাবনা ছিল, একই সময়ে একই গন্তব্যে যাওয়া যাত্রীদের যদি কোনোভাবে একসঙ্গে করা যায়, তাহলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। এই ভাবনা থেকেই তাঁরা ‘জাইগো’ (JyGo) নামের একটি ‘ভেহিকেল-পুলিং’ অ্যাপ বানিয়েছেন।
তিন উদ্যোক্তা বলছেন, অ্যাপটির ধারণা খুবই সহজ। একই সময়ে, একই পথে বা গন্তব্যে যাতায়াত করতে চান—এমন যাত্রীদের এক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করে অ্যাপটি। এরপর তাঁরা একটি ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা রিকশায় ভাগাভাগি (শেয়ার) করে গন্তব্যে যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে যাত্রীদের মধ্যে ভাড়ার খরচ ভাগ হয়ে যাবে।
ধরা যাক, কারওয়ান বাজার থেকে যাত্রাবাড়ী যেতে সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশার ভাড়া ৪০০ টাকা। এখন ‘জাইগো’ অ্যাপের মাধ্যমে একত্র হওয়া তিন যাত্রী যদি এই অটোরিকশায় গন্তব্যে যান, তাহলে ভাড়ার টাকা তাঁদের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে।
অ্যাপটি তৈরি করা বুয়েটের তিন শিক্ষার্থী মুস্তাকিম মোরসেদ (বাঁয়ে), জোবায়ের খান (মাঝে) ও আবুল বাসার (ডানে) | ছবি: উদ্যোক্তাদের সৌজন্যে
‘খরচ কমবে ৫০–৮০ শতাংশ’
উদ্যোক্তাদের দাবি, অ্যাপটি ব্যবহার করে চলাচল করলে একেকজন যাত্রীর খরচ ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসতে পারে। আর এই সেবা দেওয়ার জন্য তাঁরা যাত্রীদের কাছ থেকে আলাদা কোনো কমিশন নিচ্ছেন না।
অ্যাপটির সহ–উদ্যোক্তা জোবায়ের খান প্রথম আলোকে বলেন, এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু যাত্রীর ভাড়ার খরচ কমানো নয়। ঢাকায় যানজট যে মাত্রায় পৌঁছেছে, তাতে একইসংখ্যক যাত্রীর জন্য কমসংখ্যক যানবাহন নিশ্চিত করতে পারলে নগর–পরিবহনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। এই শেয়ারিং মডেলের মাধ্যমে সড়কে গাড়ির সংখ্যা কমানো গেলে যানজট কমবে। কমবে জ্বালানি খরচও।
৩ মাসে সাড়ে ৭ হাজার ব্যবহারকারী
চলতি বছরের জানুয়ারিতে গুগল প্লে স্টোর ও হুয়াওয়ের অ্যাপ গ্যালারিতে অ্যাপটি চালু হয়। উদ্যোক্তারা বলছেন, চালুর অল্প সময়ের মধ্যে ব্যবহারকারীদের (ইউজার) দিক থেকে ভালোই সাড়া পেয়েছে ‘জাইগো’। মাত্র তিন মাসে অ্যাপটির ব্যবহারকারীর সংখ্যা সাড়ে সাত হাজার ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিনই যুক্ত হচ্ছেন নতুন ব্যবহারকারী।
উদ্যোগটি (জাইগো) সম্প্রতি বৈশ্বিক স্টার্টআপ নেটওয়ার্ক ‘এফ৬এস’-এর শীর্ষ ‘রাইড হেইলিং’ (অ্যাপের মাধ্যমে গাড়িতে যাত্রীপরিবহন সেবা) কোম্পানির তালিকায় চার নম্বরে স্থান করে নিয়েছে।
সেবাটি এখনো ঢাকাকেন্দ্রিক। উদ্যোক্তারা বলছেন, সেবাটির পরিসর আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা আছে। এমনকি তাঁরা দেশের বাইরে এই সেবা নিয়ে যেতে চান। আগামী মাসে তাঁরা অ্যাপটির কার্যক্রম মালয়েশিয়ায় শুরু করার কথা ভাবছেন। পর্যায়ক্রমে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় সেবাটি বিস্তৃত করার চিন্তাভাবনা রয়েছে।
যেভাবে সেবা মিলবে
অ্যাপটি ব্যবহার করতে হলে প্রথমে গুগল প্লে স্টোর বা হুয়াওয়ের অ্যাপ গ্যালারি থেকে সেটি মুঠোফোনে ডাউনলোড করতে হবে। ব্যবহারকারী তাঁর নাম ও মুঠোফোন নম্বর দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করলেই অ্যাপটি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে।
অ্যাপটি খুললে দেখা যাবে, সেখানে মূলত দুই ধরনের রাইড শেয়ারিং বিকল্প (অপশন) আছে। নিয়মিত একই রুটে চলাচলকারী সহযাত্রী এবং তাৎক্ষণিকভাবে একই গন্তব্যে যাওয়া যাত্রীদের সঙ্গে সংযোগের সুযোগ।
নিয়মিত রুটের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারী তাঁর দৈনন্দিন যাতায়াতের পথ নির্ধারণ করে রাখতে পারেন। ফলে অ্যাপটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই পথে চলাচলকারী অন্য যাত্রীদের সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করবে।
অন্যদিকে তাৎক্ষণিক রুটের ক্ষেত্রে যাত্রা শুরুর আগে গন্তব্য নির্ধারণ করতে হয়। সে ক্ষেত্রে অ্যাপটি লাইভ লোকেশন ব্যবহার করে কাছাকাছি অবস্থান করা একই দিকের যাত্রীদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে।
নারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা
অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যাত্রা ভাগাভাগি করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। এ বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে অ্যাপে যুক্ত করা হয়েছে ব্যবহারকারী যাচাইকরণ, লাইভ লোকেশন ট্র্যাকিং ও জরুরি কল–সুবিধা।
অন্যদিকে নারী যাত্রীদের জন্য রাখা হয়েছে আলাদা ‘জেন্ডার প্রেফারেন্স’ নামের একটি বিকল্প (অপশন)। এর উদ্দেশ্য নারীরা যাতে প্রয়োজনে শুধু নারী সহযাত্রীদের সঙ্গেই যাত্রা ভাগাভাগি করতে পারেন।
কিছু সীমাবদ্ধতা
এ উদ্যোগের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখনো তুলনামূলক কম। ফলে অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রুটে সহযাত্রী খুঁজে পেতে সময় লাগছে।
একটি রাইড রিকোয়েস্ট (অনুরোধ) করার পর কখনো কখনো দীর্ঘ সময় যাত্রীকে অপেক্ষা করতে হয়। তাড়াহুড়ার সময় ব্যবহারকারীদের জন্য অসুবিধা তৈরি করতে পারে।
অ্যাপটির উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এ ধরনের প্ল্যাটফর্মের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করে ব্যবহারকারীর সংখ্যার ওপর। ব্যবহারকারী (যাত্রী) যত বাড়বে, তত দ্রুত মিলবে সহযাত্রী। কমবে অপেক্ষার সময়।
বুয়েটের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ইশরাত ইসলাম মনে করেন, ‘জাইগো’ উদ্যোগটি সম্ভাবনাময়। তাঁর মতে, ভাগাভাগি করে যানবাহন ব্যবহারের ধারণাটি নগর পরিবহনে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
ইশরাত ইসলাম বলেন, বিদেশে কমিউনিটি বাসের মতো ভাগাভাগির পরিবহনব্যবস্থা প্রচলিত আছে। কিন্তু ঢাকায় এ ধরনের উদ্যোগ তুলনামূলক নতুন। একই এলাকার যাত্রীদের একই যানবাহনে সংযুক্ত করার এই মডেল নিঃসন্দেহে উদ্যোক্তাদের সৃজনশীল ভাবনার প্রতিফলন। তবে পুরো প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে আরও বেশি কাজ করা দরকার।