স্থানীয় নির্বাচনেও সেনা মোতায়েনের বিধান চায় ইসি

আহমেদ ফারুক | আপডেট: ২০ জুলাই ২০২৬, ৯:২৩ সকাল

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সেনা মোতায়েনের আইনি সুযোগ রাখতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সঙ্গে দ্বৈত নাগরিক এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না—এমন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাবও করতে যাচ্ছে সাংবিধানিক এই সংস্থা। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের নেতাদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার চিন্তা আপাতত নেই।

ইসি সূত্র জানায়, জেলা পরিষদ বাদে স্থানীয় সরকারের অন্য চারটি প্রতিষ্ঠান—ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন আইনে এসব সংশোধনী আনার প্রস্তাব তৈরি করেছে ইসির আইন–বিধি সংস্কার কমিটি। স্থানীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের চর্চা না থাকলেও বিদ্যমান ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা আইনে (২০০৯ সালের) ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থা’র সংজ্ঞায় ‘প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ’ আছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে পুলিশের মতো সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের মোতায়েনের সুযোগ আছে। এখন উপজেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন আইনেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ বা সশস্ত্র বাহিনীকে যুক্ত করার পক্ষে ইসি।

আগামীকাল মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের সভায় এসব প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য তোলার কথা রয়েছে। সেখানে অনুমোদনের পর সুপারিশ আকারে এসব প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে ইসি। ইসির এসব প্রস্তাব বা সুপারিশ সরকার আমলে নিলে সংশ্লিষ্ট চারটি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরবর্তী ধাপ হবে মন্ত্রিসভায় আইনের সংশোধনী অনুমোদন এবং সংসদে বিল পাস করা।

এর আগে সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আইনগুলো অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংশোধন করা হয়েছিল। তখন দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান বাদ দেওয়া এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রশাসক নিয়োগের বিধান যুক্ত করা হয়। চলতি ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে ওই সব অধ্যাদেশ অনুমোদন করা হয়।

সেনা প্রসঙ্গ
সাধারণত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনা মোতায়েন করা হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এটি করা হয় না। ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইনে সশস্ত্র বাহিনী সংজ্ঞাভুক্ত থাকলে সুবিধা হয়। আইনে এটি যুক্ত হলে তিন বাহিনীকে নির্বাচনী দায়িত্ব দিতে আলাদা কোনো আদেশের প্রয়োজন হয় না। এ ছাড়া সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও পুলিশের মতো ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে পারেন এবং বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের ক্ষমতা পান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এমনিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংঘর্ষ-সংঘাত তুলনামূলক বেশি হয়। এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয়। সে ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতা একই এলাকায় প্রার্থী হতে পারেন। আবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের কেউ কেউ প্রার্থী হন কি না, সেটাও আলোচনায় আছে। সবমিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলা করা একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ ছাড়া পুলিশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় আছে।

নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ ইসির আইন–বিধি সংস্কার কমিটির প্রধান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এখন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনো আইনে সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীর বিষয়টি আছে, আবার কোনো কোনো আইনে তা নেই। তাঁরা সব কটি আইনের বিধান অভিন্ন রাখতে চান। তিনি বলেন, সশস্ত্রবাহিনী সংজ্ঞাভুক্ত না থাকলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন একটু কঠিন হয়। আবার আইনে থাকলেই যে ব্যবহার করতে হবে, তা নয়। কিন্তু এটি থাকলে একটি সুযোগ থাকে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ইসি যদি মনে করে, সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা প্রয়োজন, তাহলে করতে পারবে।

অযোগ্যতার নতুন বিধান প্রস্তাব
নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অযোগ্যতাগুলো সংশ্লিষ্ট আইনে উল্লেখ করা আছে। ইসি স্থানীয় সরকারের বিদ্যমান চারটি আইনে দুটি করে অযোগ্যতার বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করতে যাচ্ছে। এর একটি হলো দ্বৈত নাগরিকত্ব। এখন দ্বৈত নাগরিকদের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমন বিধান নেই। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (ইউপি মেম্বার) বাদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অন্য সব স্তরে দ্বৈত নাগরিকেরা প্রার্থী হতে পারবেন না—এমন বিধান করার পক্ষে ইসি।

আরেকটি হলো এমপিওভুক্ত শিক্ষক–কর্মকর্তারা। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক–কর্মকর্তাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা নেই। ইসি এটিকে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্যতা হিসেবে যুক্ত করার পক্ষে।

এদিকে ‘সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত কোনো রাজনৈতিক দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতা–কর্মীকে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণার বিধান সংযোজন’ করার দাবি জানায় জামায়াতে ইসলামী। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধির খসড়া নিয়ে দলটি ৩০ জুন ইসিতে যে মতামত দিয়েছে, সেখানে এই দাবি জানানো হয়। অবশ্য এটি আচরণবিধি–সংক্রান্ত কোনো বিষয় নয়।

ইসির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জামায়াতের এই দাবি পূরণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট আইনে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা অযোগ্যতা–সম্পর্কিত যেসব ধারা আছে, সেখানে সংশোধনী আনতে হবে। তবে এ ধরনের বিধান যুক্ত করার কোনো চিন্তা এখন পর্যন্ত ইসির নেই।

নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ প্রথম আলোকে বলেন, কোনো নিষিদ্ধ দলের নেতাদের নির্বাচনে অযোগ্য করার দাবিতে কোনো দল চিঠি দিয়েছে কি না, তা তাঁর জানা নেই। তবে যেহেতু স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে হবে না, তাই দলের বিষয়টি দেখার সুযোগ খুব কম থাকবে। কোনো ব্যক্তি প্রার্থী হতে চাইলে ওই পদে যেসব যোগ্যতা থাকা দরকার, সেগুলো ঠিক থাকলে তিনি প্রার্থী হতে পারবেন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা–অযোগ্যতা–সম্পর্কিত বিধানে কোনো সংশোধনী প্রস্তাব করা হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, তাঁরা প্রস্তাব করতে যাচ্ছেন এমপিওভুক্ত স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজের শিক্ষক বা সার্বক্ষণিক কোনো কর্মচারী নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। এ ছাড়া তাঁরা মনে করেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনেও দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকাকে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্যতা হিসেবে নির্ধারণ করা উচিত।

নির্বাচন কমিশনের এই প্রস্তাবগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আবদুল আলীম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গত জাতীয় নির্বাচনের আগে অনেক গুজব ছিল। সে নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ভূমিকার কারণে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ছিল। স্থানীয় সরকার আইনে সশস্ত্র বাহিনীকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞাভুক্ত করা হলে মানুষের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা যাবে।

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.