সংসদের প্রথম অধিবেশন এবং সংস্কারের ভবিষ্যৎ

John Smith | আপডেট: ১২ মার্চ ২০২৬, ১২:৫৮ দুপুর

অন্তর্বর্তী সরকারে আমাদের সময়টা ছিল দুর্দান্ত এক রোলার কোস্টারে চড়ে বসার মতো। সেখানে উত্তেজনা, রোমাঞ্চ, আনন্দ ছিল; ছিল অনিশ্চয়তাও। তবে আমাদের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল এবং আমরা অচেনা রোলার কোস্টারে চড়েই সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি।

আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল তিনটি—বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। এর মধ্যে ১২ মার্চের নতুন সংসদের অধিবেশন সামনে রেখে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সংস্কারের বিষয়গুলো। আমাদের আমলে এসব সংস্কার সম্পাদন করা হয়েছে অধ্যাদেশের মাধ্যমে। এই অধ্যাদেশগুলো অকেজো ও অর্থহীন হয়ে পড়বে, যদি সংসদ তার প্রথম বৈঠকের ৩০ দিনের মধ্যে এগুলো গ্রহণ না করে। এসব অধ্যাদেশকে সংসদের আইনে পরিণত করা সরকারের জন্য কঠিন কাজ নয়। কারণ, এগুলো দ্বারা সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদের পরিবর্তন আনা হয়নি বা এতে সংবিধানপরিপন্থী কোনো বিধান রাখা হয়নি। তবে অধ্যাদেশের মাধ্যমে সম্পাদিত এসব সংস্কারের গুরুত্ব সাংবিধানিক সংস্কারের চেয়ে কম নয়।

২.

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করা হয়। এর মধ্যে ১৪টি ছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনসংক্রান্ত। বাকি ১১৯টি অধ্যাদেশের মধ্যে প্রায় সব কটিই সংস্কারধর্মী। এর এক-তৃতীয়াংশ (৩৮টি) আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত।

এসব আইন প্রণয়নের সঙ্গে আইন উপদেষ্টা হিসেবে আমি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলাম বলে এর সুফল সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি। তার আগে বলে রাখি, এ কাজে আইন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি রাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ আইন কর্মকর্তাও যুক্ত ছিলেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যাপক আনুষ্ঠানিক পরামর্শ করা হয়েছে এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে।

আইন ও বিচারব্যবস্থা–সম্পর্কিত এসব অধ্যাদেশের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের ভোগান্তি হ্রাস ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। এর কয়েকটির পরিমেয় সুফল ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। যেমন আইনগত সহায়তা–সংক্রান্ত (লিগ্যাল এইড) দুটি অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার পর মধ্যস্থতার মাধ্যমে (আদালতের দ্বারস্থ না হয়ে) বিরোধ নিষ্পত্তির হার কমপক্ষে তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে; দেওয়ানি কার্যবিধির সংস্কারের মাধ্যমে দেওয়ানি মামলার নিষ্পত্তি অনেক কম সময়ে করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে; ফৌজদারি কার্যবিধির সংস্কারের মাধ্যমে গ্রেপ্তার ও বিচারপ্রক্রিয়ায় মানুষের অধিকার আরও সুরক্ষিত হয়েছে; রেজিস্ট্রেশন আইনের সংশোধনের কারণে জমি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় ভোগান্তি হ্রাস পেয়েছে।

আইন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর মাধ্যমে বিচারকের পদ সৃষ্টি, বিচার বিভাগের উন্নয়ন এবং বাজেট ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা প্রধান বিচারপতির নিয়ন্ত্রণাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে। সচিবালয় সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হওয়া সাপেক্ষে নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ (বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা) ক্ষমতাও সুপ্রিম কোর্টের কাছে ন্যস্ত করার বিধান করা হয়েছে। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশের মাধ্যমে যোগ্যতা ও দক্ষতা যাচাই করে উচ্চ আদালতে ৪৭ জন বিচারককে নিয়োগ করা হয়েছে। এ অধ্যাদেশ দুটো বর্তমান সংসদ আইন হিসেবে গ্রহণ করলে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আইনি সংস্কারের মাধ্যমে নতুন বিশেষায়িত আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশে ধর্ষণ ও অন্যান্য অপরাধের দ্রুত ও সঠিক বিচারের বিধান করা হয়েছে এবং শিশু ধর্ষণ অপরাধের বিচারের জন্য স্বতন্ত্র আদালত প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশের মাধ্যমে দ্রুত ও হয়রানিমুক্তভাবে বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে স্বতন্ত্র বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রণীত আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে গুম প্রতিরোধ এবং মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করা। এ দুটি অধ্যাদেশ প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় আমরা দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ করেছি।

আইন মন্ত্রণালয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ প্রণয়ন। এ অধ্যাদেশে ফ্যাসিস্ট শাসকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ হিসেবে যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, সেসব ক্ষেত্রে জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকালে জীবনের মায়া ত্যাগ করে যেসব তরুণ রাজপথে নেমেছিল, তাদের প্রতি সুবিচার করতে হলে অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করা প্রয়োজন।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ এবং জুলাই স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ—এ দুই অধ্যাদেশও একই কারণে নতুন সংসদ গ্রহণ করবে বলে আমরা আশা করি।

৩.

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অন্যান্য ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ প্রণীত হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা, ক্ষমতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি করা হয়েছে। বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) অধ্যাদেশের মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে হয়রানি রোধ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিধান করা হয়েছে। সরকারি চাকরিসংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলোর মাধ্যমে জনপ্রশাসন সচল রাখার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশের মাধ্যমে তফসিলি ব্যাংকের আর্থিক সংকট কাটাতে প্রয়োজনীয় বিধান করা হয়েছে।

এ সময়ে জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন অধ্যাদেশও প্রণীত হয়েছে। যেমন মানব পাচার অধ্যাদেশে অভিবাসীদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে; বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশে বিমান ভাড়ায় কারসাজি রোধে সুদৃঢ় আইনগত কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে; পরিত্যক্ত বাড়ি (সম্পূরক বিধানাবলি) অধ্যাদেশের মাধ্যমে হস্তান্তর গ্রহীতার ভোগান্তি দূর করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে; বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসাশিক্ষকদের আওতাভুক্ত করা হয়েছে; মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশে অঙ্গ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রতিস্থাপনকে সহজসাধ্য ও জবাবদিহিমূলক করা হয়েছে; বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশের মাধ্যমে শ্রমিকের অধিকার ও সুরক্ষা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

দুর্নীতি রোধ ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থ অধ্যাদেশ ও অর্থসংক্রান্ত কতিপয় আইন সংশোধনের মাধ্যমে মূল্য সংযোজন কর, সম্পূরক শুল্ক ও কাস্টমস আইনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশের মাধ্যমে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়াকে মানসম্পন্ন ও স্বচ্ছ করা হয়েছে।

পরিবেশ উন্নয়নে বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশে সংরক্ষিত এলাকা ও গণপরিসরে বৃক্ষসম্পদ সংরক্ষণ জোরদার করা হয়েছে। বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ অধ্যাদেশে এসব ইকোসিস্টেম রক্ষায় কঠোর বিধান করা হয়েছে। এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্য ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, উপাত্ত সংগ্রহ, স্থানিক পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ এবং মৎস্যসম্পদ রক্ষায় বিভিন্ন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এসব অধ্যাদেশ গ্রহণ না করার যথেষ্ট বা যুক্তিসংগত কারণ নেই। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন সরকার আনতে পারে। তবে এর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আইনগুলোকে আরও জনস্বার্থমূলক করে তোলা।

৪.

অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু সংস্কার উদ্যোগ ছিল উচ্চাভিলাষী। এসব উদ্যোগের সঙ্গে সংবিধান পরিবর্তনের বিষয় জড়িত ছিল বলে সেগুলো বাস্তবায়ন করার এখতিয়ার সরকারের ছিল না। এ কারণে জুলাই সনদ ও জুলাই আদেশের মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদ কর্তৃক এসব সম্পাদনের সুযোগ রেখে দেওয়া হয়েছে।

আমরা অবগত, জুলাই আদেশের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে কারও কারও মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তবে আমরা ডকট্রিন অব নেসেসিটি এবং ডকট্রিন অব উইল অব দ্য পিপল সম্পর্কে সচেতন ছিলাম। নির্বাচিত সংসদ পোস্টভ্যালিডিটি দিয়ে সংবিধান সংশোধন করেছে—এমন নজিরগুলোও আমাদের প্রত্যাশা নির্ধারণে বিবেচনায় রাখা হয়েছিল। এসব বিবেচনায় বর্তমান সরকারের সুযোগ রয়েছে সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করার।

মনে রাখা প্রয়োজন, অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান সংস্কারের বিশদ প্রস্তাব তৈরি করেছিল নিজের ক্ষমতা ধরে রাখা বা বৃদ্ধি করার জন্য নয়; এটি করা হয়েছিল জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে একটি জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য।

বিএনপি অতীতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ও কল্যাণকর সাংবিধানিক সংস্কার (তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সংসদীয় সরকারব্যবস্থা) করেছিল। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বিএনপি অনুরূপ ভূমিকা অব্যাহত রাখবে—এমন প্রত্যাশা সমাজে রয়েছে।

● আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা

* মতামত লেখকের নিজস্ব

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.