বিচারহীনতায় বেপরোয়া মানব পাচারকারীরা

John Smith | আপডেট: ১ এপ্রিল ২০২৬, ৯:৩৫ সকাল

অবৈধ পথে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন বন্ধ করতে না পারায় তরুণদের মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না।

লিবিয়া থেকে ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে অনাহারে বাংলাদেশি ২০ তরুণের মৃত্যু কিংবা নিখোঁজের শঙ্কার খবরটি আমাদের বেদনাহত করে। জীবন বাজি ধরে ‘ভাগ্য বদলের’ এই মরিয়া চেষ্টার পেছনে নিশ্চিত করেই দেশে তরুণদের জন্য শোভন কর্মসংস্থান ও মানসম্মত জীবনযাপন সৃষ্টি করতে না পারার ব্যর্থতা রয়েছে। তবে আমরা মনে করি, মানব পাচার বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে না পারার ব্যর্থতা এবং মানব পাচারকারীদের বিচার না হওয়ায় একই ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে।

লিবিয়া হয়ে গ্রিসে পাড়ি জমাতে গিয়ে প্রাণ হারানো ২৩ বছরের হতভাগ্য যুবক শায়েক আহমেদের গল্পই বলে দেয় এই অবৈধ অভিবাসন কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে সুনামগঞ্জের এই তরুণকে তাঁর দরিদ্র পরিবার নিজেদের শেষ সম্বল গরু, জমি বিক্রি করে ১২ লাখ টাকা দালালদের হাতে দিয়েছিল। গত ২১ মার্চ রওনা দেওয়া রাবারের নৌকাটি ভূমধ্যসাগরে পথ হারিয়ে ছয় দিন ভেসে ছিল। খাবার ফুরিয়ে যাওয়ায় অনাহারে তাঁর মৃত্যু হয়। এই যাত্রায় শুধু এই তরুণ নন, সুনামগঞ্জেরই ১২ তরুণের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের লাশগুলো সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের অভিবাসনপ্রত্যাশী তরুণদের জন্য লিবিয়া মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠেছে। নজরদারি না থাকায় উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে দালাল চক্র সহজেই তরুণদের আকৃষ্ট করতে পারছে। মানব পাচার এখন একটি বিস্তৃত ও সংগঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। একদিকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে তাঁদের সন্তানেরা সাগরে ডুবে, অনাহারে মারা যাচ্ছেন অথবা বিদেশের জেলে বন্দী হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তথ্যই বলছে, বহুস্তরের এই মানব পাচার চক্র কতটা মুক্তভাবে তাদের অপরাধের জাল বিস্তার করেছে। গত এক বছরে অবৈধ পথে ১৭ হাজার বাংলাদেশিকে ইতালিতে পাঠানো হয়েছে।

শুধু ইতালি বা গ্রিস নয়, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়াতেও অবৈধ অভিবাসনের মানব পাচার চক্র সক্রিয় রয়েছে। বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার এই পথেও বাংলাদেশি তরুণদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় পাঠানো তরুণদের ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর ঘটনাও সম্প্রতি দেখা গেছে।

মানব পাচার নিয়ে এত আলোচনা ও হইচই হওয়ার পরও মানব পাচারকারীদের বিচার না হওয়ায় অবৈধ অভিবাসন কমছে না; বরং বাড়ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মামলা হয় না, আবার যেসব ঘটনায় মামলা হয়, সেখানেও বিচারের হার নগণ্য। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৪—এই পাঁচ বছরে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে প্রায় সাড়ে চার হাজার মামলা হলেও এসব মামলায় ৯৪–৯৫ শতাংশ আসামিই খালাস পেয়ে যান। এ রকম বিচারহীনতার সংস্কৃতিই মানব পাচারকারীদের বেপরোয়া করে তুলেছে।

এটা সত্যি যে একটি সংগঠিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও সমন্বয় ছাড়া মানব পাচার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে দেশি দালাল চক্র ও মানব পাচারকারীদের বিচারের মুখোমুখি ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিতের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা গেলে তরুণদের মৃত্যুর মিছিল অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। এর জন্য সবার আগে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

অবৈধ অভিবাসনে বাংলাদেশি তরুণদের এই মৃত্যুযাত্রা যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে।

 

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.