পাবনায় নদীর পানি বিক্রি করে চলছে সংসার

John Smith | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ৯:২৫ সকাল

যমুনা নদী থেকে পানি সংগ্রহ করছেন এক পানি বিক্রেতা। সম্প্রতি বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জ এলাকায়

ভোরের আলো ফোটার আগেই যমুনা নদীতে নামেন আমানত আলী (৪০)। এরপর বড় ড্রাম ও বিশেষ প্লাস্টিকের পাত্রে সংগ্রহ করেন পানি। এগুলো নিজেই আবার ভ্যানে করে পৌঁছে দেন হোটেল, চায়ের দোকান, ক্ষুদ্র কারখানা, বিয়ের অনুষ্ঠান কিংবা কোনো বাড়িতে। এভাবে নদীর পানি বিক্রির আয়েই চলে তাঁর সংসার।

আমানত আলী পাবনার বেড়া পৌর এলাকার বাসিন্দা। বিচিত্র এ পেশার কারণে তিনি এলাকায় বেশ পরিচিত।

আমানত আলী বলেন, ‘পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে এই কাজ করতেছি। প্রতিদিন ৫০০-৬০০ টাকার মতো আয় হয়। এই আয়ে ভালোভাবেই সংসার চইল্যা যায়। আর কাজটি করতি ভালোও লাগে।’

বেড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আমানত আলী একা নন—এ পেশায় যুক্ত আছেন আরও অন্তত ২৫ জন। তাঁরা যমুনা ও হুরাসাগর নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে বিভিন্ন দোকান, হোটেল, চায়ের স্টল, ক্ষুদ্র কারখানা ও অনুষ্ঠানসহ বাসাবাড়িতে সরবরাহ করেন।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও চায়ের দোকানগুলোতে নদীর পানির চাহিদা বেশি। তাঁদের দাবি, নদীর পানিতে রান্না করলে ও চা বানালে খাবারের রং-স্বাদ ভালো থাকে। এলাকার বেশির ভাগ নলকূপের পানিতে অতিরিক্ত আয়রন মেলে। এ ছাড়া ভাত-ডাল ঠিকমতো সিদ্ধ হয় না, চায়ের রংও ভালো হয় না। পৌরসভার সরবরাহকৃত পানিও খুব একটা ভালো নয়। এসব কারণে স্থানীয়ভাবে নদীর পানির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে।

বেড়া বাজারের হোটেল ব্যবসায়ী এনামুল হক বলেন, নলকূপের পানিতে আয়রন বেশি থাকায় রান্না ভালো হয় না। নদীর পানি ব্যবহার করলে ভাত, ডালসহ সবকিছুর মান ভালো থাকে, স্বাদও ঠিক থাকে। পানি বিক্রেতারা ভ্যানে করে দোকানে পানি পৌঁছে দিয়ে যান।

টিউবওয়েলের পানিতে চায়ের রং ঠিক আসে না বলে জানান মোহনগঞ্জ বাজারের চা বিক্রেতা মোকবুল হোসেন। তিনি বলেন, নদীর পানি ফুটিয়ে ব্যবহার করলে চায়ের স্বাদ ভালো হয়।

পানি বিক্রেতারা সাধারণত ২৫ লিটার ধারণক্ষমতার বিশেষ প্লাস্টিকের পাত্রে পানি সরবরাহ করেন, যা স্থানীয়ভাবে ‘ডোপ’ নামে পরিচিত। প্রতি ডোপ পানির দাম নেওয়া হয় ১৫-২০ টাকা। একজন বিক্রেতা দিনে ২৫-৩০ ডোপ পানি সরবরাহ করেন। এতে তাঁদের দৈনিক আয় হয় প্রায় ৪০০-৬০০ টাকা।

বেড়া বাজারের পানি বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘হুরাসাগর নদী থেকে পানি আইন্যা বিভিন্ন দোকানে দিই। এই আয় দিয়াই সংসার চলে। অন্য কোনো কাজ না থাকায় এই কামে আছি।’

বেড়ার মনজুর কাদের মহিলা কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, এই পেশাজীবীদের কাছে যমুনা ও হুরাসাগর শুধু নদী নয়—এগুলো তাঁদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। নদীর ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে এক ভিন্নধর্মী পেশা, যা এখনো টিকিয়ে রেখেছে বেশ কিছু পরিবারের জীবন-জীবিকার চাকা।

তবে নদীর পানি সরাসরি ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তাহমিনা সুলতানা জানান, নদীর পানিতে জীবাণু ও দূষিত উপাদান থাকতে পারে। অপরিশোধিত পানি ব্যবহার করলে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি থাকে। তাই পানি ফুটিয়ে বা প্রাথমিকভাবে পরিশোধন করে ব্যবহার করা জরুরি।

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.