কক্সবাজারে দেড় মাসেই আস্ত পাহাড় কেটে সমতল

John Smith | আপডেট: ৫ মার্চ ২০২৬, ৯:২০ সকাল

দেড় মাস আগেও ছিল আস্ত একটা পাহাড়। বড় বড় গাছের সারি। ঘন জঙ্গল। আশপাশে এত বড় ও উঁচু পাহাড় আর না থাকায় পাহাড়টি স্থানীয় লোকজনের কাছে ‘আসমানের খুঁটি’ নামে পরিচিত ছিল। মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে পাহাড়টির এক-তৃতীয়াংশ নাই হয়ে গেছে। রাতে-দিনে দুটি এক্সক্যাভেটর (খননযন্ত্র) দিয়ে আড়াই একরের পাহাড়টি কেটে সমতল বানিয়ে ফেলা হয়েছে।

এটি কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের জালিয়ারচাং এলাকার একটি পাহাড়ের চিত্র। বিশালাকৃতির এই পাহাড় স্থানীয় চারজনের একটি চক্র কেটে সাবাড় করে ফেলেছেন।

আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া (এবিসি) আঞ্চলিক মহাসড়কের পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের পুরোনো ইউপি কার্যালয় থেকে পূর্ব দিকে ৮০০ মিটার গেলেই জালিয়ারচাং জামে মসজিদ। মসজিদ থেকে হাতের বামে দেড় শ মিটার গেলে চোখে পড়ে পাহাড় কাটার দৃশ্য।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. খালেকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাহাড়টি সংরক্ষিত বনের নয়। এটি সংরক্ষিত বন থেকে ২৯০ মিটার দূরে। এ ক্ষেত্রে চোখের সামনে পাহাড় কাটা পড়লেও আমাদের করার কিছু থাকে না। এটি ব্যক্তি মালিকানাধীন। এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থার সুযোগ আছে পরিবেশ অধিদপ্তর বা উপজেলা প্রশাসনের।’

সরেজমিনে দেখা যায়, পাহাড় কেটে তৈরি করা সমতল জায়গাটি বিশালাকৃতির মাঠের সমান। দুই পাশে পাহাড়ের কাটা অংশে খননযন্ত্রের ক্ষত। পাহাড় থেকে উপড়ে ফেলা বড় বড় গাছের শেকড় বেরিয়ে আছে কাটা অংশ দিয়ে। কিছু পড়ে আছে মাটিতে।

পাহাড়ের পাদদেশের দুই অংশে দুটি ঘর। মাঝখানে পাহাড় কেটে সমতল করে মহাসড়কের মতো রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। একটি ঘরের মালিক মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, ‘প্রবাসী আমান উল্লাহ পাহাড়টির মালিক। তিনি পাহাড়টির মাটি কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালীকে বিক্রি করে দিয়েছেন।’

মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, ‘এই পাহাড় বহু বছরের পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী। স্থানীয়ভাবে এটিকে আসমানের খুঁটি বলা হয়। পাহাড়টি কেটে ফেলায় আমরা চরম ঝুঁকিতে রয়েছি। পাহাড় কাটা যখন শুরু হয়, তখন কয়েক দিন প্রতিবাদ করেছিলাম। তাঁরা বাধা মানেননি, একপর্যায়ে আমাদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এরপর চুপ হয়ে যাই।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমানউল্লাহ স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালীর কাছে পাহাড়ের মাটি বিক্রি করেছেন। তাঁরাই রাত-দিন খননযন্ত্র দিয়ে কেটে পাহাড়টি সাবাড় করেছেন। এদের মধ্যে আবু তাহের নামের একজন পাহাড় কাটার কথা স্বীকার করেছেন।

পাহাড় কাটার অভিযোগ সম্পর্কে আবু তাহের বলেন, পাহাড়টি ব্যক্তি মালিকানাধীন। বন বিভাগেরও নয়। ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড় বলেই কাটা হয়েছে। পাহাড় না কাটতে আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে তিনি জানেন না বলে জানান। তবে আমান উল্লাহ প্রবাসে থাকায় তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়নি।

ব্যক্তি মালিকানাধীন হলেও পাহাড় বা টিলা কাটা আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি বা ছাড়পত্র ছাড়া সরকারি, আধা সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড় কাটা বা মোচন করা দণ্ডনীয় অপরাধ। আইন অমান্য করলে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা জরিমানা, এমনকি উভয় দণ্ড হতে পারে।

জানতে চাইলে পেকুয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ এস এম নুরুল আখতার নিলয় প্রথম আলোকে বলেন, ‘জালিয়ারচাংয়ের পাহাড় কাটার বিষয়টি আমরা জেনেছি। পাহাড়টি বন বিভাগেরও নয়। ব্যক্তি মালিকানাধীন হলেও অনুমতিবিহীন পাহাড় কাটার সুযোগ নেই। আমরা এই পাহাড় কাটার বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেব।’

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘পেকুয়ায় পাহাড় কাটার বিষয়টি আমাদের জানা নেই। তবে সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন কোনো পাহাড়ই কাটার সুযোগ নেই। আমি এখনই খোঁজ নিচ্ছি। দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.