তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে আগেভাগে প্রস্তুতি ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে নাগরিকদের ঈদযাত্রা অনেকটাই স্বস্তির হয়।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মাথায় পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হতে যাচ্ছে। মহাসড়কের করুণ দশার সঙ্গে জ্বালানি তেলের ব্যবস্থাপনার ঘাটতি হলে একটি ভোগান্তিমুক্ত ঈদযাত্রা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। গত কয়েক দিনে ঈদযাত্রা নিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদনগুলো থেকে সেই ইঙ্গিতই মিলছে। ঢাকা–বরিশাল, ঢাকা–টাঙ্গাইল–রংপুর, ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক, ঢাকা–চট্টগ্রাম, ঢাকা–ময়মনসিংহ—প্রতিটি মহাসড়কে খানাখন্দ, অবৈধ বাজার, টোল প্লাজা, বিআরটি লেন, ধীরগতির যানের কারণে যানজট ও ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে। আমরা মনে করি, প্রতিটি মহাসড়ক ধরে সমন্বিত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এবারের ঈদযাত্রায় বাস, লঞ্চসহ সব ধরনের পরিবহনেই নানা কৌশলে যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। জ্বালানি–সংকটের অজুহাত তুলে অনেক কাউন্টার বন্ধ রেখে কালোবাজারে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে, আবার কোথাও বাড়তি ‘সার্ভিস চার্জ’ বা ‘বিশেষ ট্রিপ’ দেখিয়ে ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে। অনলাইনে টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রেও মধ্যস্বত্বভোগীদের সক্রিয়তা দেখা গেছে।
পরিবহন খাত ঘিরে অসাধু গোষ্ঠীর সুযোগসন্ধানী আচরণ যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে এমন ভাড়ানৈরাজ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিম্ন আয়ের মানুষ। তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থের বড় একটা অংশ চলে যায় পরিবহন খাতের সিন্ডিকেটের পকেটে। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে ভাড়া নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং কঠোর নজরদারি বাড়ানো গেলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সড়ক দুর্ঘটনা ঈদযাত্রার আরেকটি বড় উদ্বেগ। উৎসবের আগে ও পরে কয়েক দিনে সড়কে যানবাহনের চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। ক্লান্ত চালক, অতিরিক্ত যাত্রী, অনিয়ন্ত্রিত গতি এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন—সব মিলিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন চলাচল, উল্টো পথে গাড়ি চালানো কিংবা ট্রাফিক নিয়ম না মানার প্রবণতাও দুর্ঘটনা বাড়িয়ে দেয়। প্রতিবছর ঈদের সময় বহু মানুষ প্রাণ হারান, আহত হন অসংখ্য। এই পরিস্থিতি শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি বহু পরিবারের জন্য স্থায়ী শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। মহাসড়কে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সীমিত করা, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং রেল ও বাসের টিকিট বিক্রিতে শৃঙ্খলা আনতে বিশেষ ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং যাত্রীসেবামূলক তথ্যকেন্দ্র চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
এসব উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও মূল প্রশ্ন হলো বাস্তবায়ন। বাংলাদেশে অনেক সময়ই দেখা যায়, ঘোষণার তুলনায় বাস্তব পদক্ষেপ দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোও এই সমস্যার সমাধানে সহায়ক হতে পারে। অনলাইন টিকেটিং ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য করা, সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি বাড়ানো এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে অনিয়ম কমানো সহজ হবে।
ঈদযাত্রা কোনো সংকটের প্রতীক হওয়া উচিত নয়। আগাম প্রস্তুতি ও সঠিক ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে বেশি জরুরি।