১৭ বছরের ক্যারিয়ারে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৩৫০-এর বেশি গোল করেছেন। আর্জেন্টিনার হয়ে ৭৮ ম্যাচে ৫৬ গোল করে দীর্ঘদিন ছিলেন দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা, যে রেকর্ড পরে অন্য সব রেকর্ডের মতোই নিজের করে নিয়েছেন লিওনেল মেসি।
সম্প্রতি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ইংল্যান্ড কিংবদন্তি রিও ফার্ডিনান্ডের পডকাস্ট ‘রিও ফার্ডিনান্ড প্রেজেন্টস’-এ হাজির হয়েছিলেন ৫৭ বছর বয়সী সাবেক এই আর্জেন্টাইন তারকা। সেই আড্ডায় উঠে এল অভাবের তাড়নায় বাতিগোলের ফুটবল বেছে নেওয়া, ম্যারাডোনার একাকী মৃত্যু আর অসহ্য যন্ত্রণায় নিজের পা কেটে ফেলার আকুতির মতো সব শিহরণজাগানো গল্প।
ফুটবলার নয়, হতে চেয়েছিলেন চিকিৎসক
ছোটবেলায় বাতিস্তুতার স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। ফুটবল? সেটা তখন তাঁর জীবনের লক্ষ্যই ছিল না। বরং বাস্কেটবল, টেনিস, হ্যান্ডবল, জিমন্যাস্টিকস, এমনকি ব্যালে নাচও শিখেছিলেন। বাতিস্তুতা হাসতে হাসতে বললেন, ‘এগুলো আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। বাস্কেটবল আমাকে লাফাতে শিখিয়েছে, টেনিস শিখিয়েছে দ্রুত নড়াচড়া করতে এবং পায়ের কাজ দ্রুত করতে।’
কিন্তু চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন? সেটা থেমে যায় পরিবারের আর্থিক অনটনে। পড়াশোনার খরচ জোগাতে বাড়ি থেকে ৫০০ কিলোমিটার দূরে রোজারিওতে চলে গেলেন। সেখানেই প্রথম দেখা হলো মার্সেলো বিয়েলসার সঙ্গে। ‘তিনি ছিলেন চরম পেশাদার, আর আমি পেশাদার ফুটবল সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। তিনি আমাদের দৌড়ানো, অনুশীলন করা, খাওয়া সবকিছু শিখিয়েছেন। তিনিই আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোচ’—বলেছেন বাতিস্তুতা।
ফ্লোরেন্স যাঁকে প্রথমে চায়নি
রোজারিওর নিওয়েলস ওল্ড বয়েজ, সেখান থেকে রিভার প্লেট, তারপর বোকা জুনিয়র্স। ১৯৯১ সালে আর্জেন্টিনার পাঠ চুকিয়ে যোগ দিলেন ইতালির ক্লাব ফিওরেন্তিনায়।
শুরুটা মোটেও রূপকথার মতো ছিল না। রিও ফার্ডিনান্ড জিজ্ঞেস করলেন, ‘ফ্লোরেন্সে যাওয়ার পর কি সঙ্গে সঙ্গেই আপনার ভালো লেগেছিল?’
‘একদমই না’—বাতিস্তুতার সরাসরি উত্তর।
শুরুতে ফ্লোরেন্সও তাঁকে পছন্দ করেনি। দলও সিরি ‘বি’ থেকে সিরি ‘আ’তে ওঠার জন্য সংগ্রাম করছিল। কিন্তু বাতিস্তুতা থাকলেন। কারণ, ওটাই ছিল তাঁর পরিবারের আর্থিক সমস্যার সমাধানের একমাত্র পথ। তাই কঠোর পরিশ্রম শুরু করলেন। গোল আসতে লাগল। ধীরে ধীরে ফ্লোরেন্সের দর্শকেরাও তাঁকে বুকে টেনে নিলেন।
সেই শহরে বাতিস্তুতা ছিলেন ১০ বছর। সিরি ‘বি’ জিতিয়ে দলকে শীর্ষ লিগে তুলেছেন। জিতেছেন ইতালিয়ান কাপ, সুপার কাপও।
সপ্তাহে মাত্র একটা সুযোগ
নব্বইয়ের দশকের সিরি ‘আ’ শুধুই একটা ফুটবল লিগ ছিল না, ছিল ফুটবলে রক্ষণ-কৌশল শেখার এক অলিখিত বিশ্ববিদ্যালয়। পাওলো মালদিনি, ফ্রাঙ্কো বারেসি, ফ্যাবিও ক্যানাভারো এবং আলেসান্দ্রো নেস্তা—এঁদের পাশ কাটিয়ে গোল করা মানে ছিল প্রায় অসাধ্য সাধন। মাউরো তাসোত্তি, আলেসান্দ্রো কোস্তাকুর্তা, জিউসেপ্পে বার্গোমি, চিরো ফেরারা, পিয়েত্রো ভিয়েরচউড আরও কত নাম! প্রতি সপ্তাহে নতুন বাধা, নতুন চ্যালেঞ্জ। ফার্ডিনান্ড জানতে চাইলেন, এটা কতটা কঠিন ছিল? বাতিস্তুতার মুখে যেন এখনো পুরোনো যন্ত্রণার ছায়া, ‘ভয়াবহ। সেই সময় প্রতি ম্যাচে হয়তো একটি বা দুটি সুযোগ পাওয়া যেত। সারা সপ্তাহ সেই একটি সুযোগের জন্যই প্রস্তুতি নিতে হতো।’
সকালে ছেলের জন্ম, রাতে গোল
১৯৯৮ বিশ্বকাপ। ফ্রান্সে ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা। রিও ফার্ডিনান্ড সেই দিনের কথা মনে করলেন, ‘আমি খুব নার্ভাস ছিলাম, কারণ আমি জানতাম, আপনি এক সুযোগেই গোল করে দেবেন।’
বাতিস্তুতা হাসলেন। তাঁর জন্যও ওই ম্যাচটি ছিল বিশেষ। কারণ, সেদিন সকালেই জন্ম হয়েছিল তাঁর তৃতীয় ছেলের। তবু দলের হয়ে মাঠে নামলেন।
ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার লড়াই তো শুধু ফুটবল নয়। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের আবেগ, ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’–এর স্মৃতি—প্রতিটি ম্যাচে ইতিহাস নেমে আসে মাঠে।
সেই ম্যাচে বেকহামের লাল কার্ড, সিমিওনের চতুরতা, মাইকেল ওয়েনের অবিশ্বাস্য গোল—বাতিস্তুতার স্মৃতিতে সব স্পষ্ট। ‘সিমিওনে সব সময়ই জেতার জন্য পাগল থাকত। আর ওয়েন কী যে দ্রুতগতির ছিল!’