আপনারও কি ঢাকায় পা রাখার অভিজ্ঞতা একই রকম

John Smith | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬, ১০:৩১ দুপুর

২০১৮ সাল। মাধ্যমিক পাস করেছি। কলেজে ভর্তি হব। ঢাকা কলেজ চিনতাম না। বন্ধু রিদওয়ান জানাল, ঐতিহ্যবাহী কলেজ। গুগল করে দেখলাম রাজবাড়ির মতো একটা স্কেচ। কৌতূহল জাগল। আরেকটু খুঁজে দেখি এ কলেজে হুমায়ূন আহমেদ পড়েছেন। ব্যস, ঠিক করলাম এখানেই পড়ব। আমার ছিল লেখক হওয়ার সাধ!

পছন্দের তালিকায় ঢাকা কলেজ দিলাম এক নম্বরে। সুযোগও হয়ে গেল। ভর্তি হয়ে গেলাম। তারপর একদিন ভারী ভারী ব্যাগ নিয়ে ঢাকায় হাজির। সঙ্গে ছিলেন বাবা। তিনি সেই রেখে গেলেন। তারপর ছোটখাটো অনেক দায়িত্ব এসে পড়ল নিজের কাঁধে। প্রতিবছর স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী মোটামুটি এভাবেই ঢাকায় পা রাখেন। এসব শিক্ষার্থীর বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত। আর্থিক অবস্থা খুব সচ্ছল না। তাঁদের প্রত্যেকেরই ঢাকায় থাকার পরিবর্তে ঢাকায় টিকে থাকতে হয়।

পানিরও আবার অভাব থাকে!’
ঢাকায় আসার আগে রিদওয়ান এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তিনি ‘ব্যাচেলর ফ্ল্যাটে’ আমাদের জন্য দুটি ‘সিটের’ ব্যবস্থা করেছিলেন। সেখানে পৌঁছে দুজনেরই প্রায় কান্না পেয়ে গেল।

ফ্ল্যাটটি ভবনের নিচতলায়। চারপাশে আরও ভবন। আলো ঢোকার সামান্যতম সুযোগ নেই। ব্যাগ রেখে একটু জিরিয়ে নিলাম। পিপাসা পাওয়ায় রান্নাঘরের দিকে এগোলাম। এক বড় ভাই বললেন, ‘পানির একটু ক্রাইসিস (সংকট) চলে।’ প্রথমে বিষয়টা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আনমনে বলে ফেলেছিলাম, ‘পানিরও আবার অভাব থাকে!’

এখন ঢাকায় প্রায় ৯ বছর। পানিরও যে অভাব থাকতে পারে, এটা জানা হয়ে গেছে। আরও জানা হয়েছে, যে ফ্ল্যাটগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়, তা আসলে পরিবার নিয়ে থাকার মতো নয় বলেই ‘ব্যাচেলরদের’ দেওয়া হয়। এসব বিষয় স্বাভাবিক মেনে নিয়ে ঢাকায় থাকেন হাজারো শিক্ষার্থী।

পানি ও গ্যাসসংকট, উচ্চ বাসাভাড়ার মতো বিষয়গুলো থেকে বাঁচতে অনেকেই কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলোয় ছোটেন। সেখানে আবার অন্য সমস্যা।

ছাত্রাবাস আর হল
২০২০ সালে কলেজের ছাত্রাবাসে একটি আসন বরাদ্দ পাই। কেবল উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রদের জন্য নির্মিত ছাত্রাবাসটিতে সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলক ভালো। তবে সবার সে ভাগ্য ছিল না। অনেককেই জীর্ণ পুরোনো ছাত্রাবাসগুলোয় থাকতে হতো। কেউ কেউ তখনো ‘ব্যাচেলর ফ্ল্যাটে’ থাকে।

সে বছর শাহিদ রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়। তার বাড়ি বগুড়া। পড়ালেখায় এক বছরের বড় হলেও শাহিদ আমার বন্ধু। সে বিজয় একাত্তর হলে একটি সিট পায়। এক শীতের রাতে আমার ছাত্রাবাসে হাজির শাহিদ। বলল, ‘তোর এখানে আজ থাকতে হবে। হলের বড় ভাইয়েরা সারা রাত বাইরে থাকতে বলছে। আমার সাইনাসের সমস্যা। ফাঁকি দিয়ে আসছি।’ কিছুদিন আগপর্যন্ত চলা গণরুম সংস্কৃতির কথা এখন আর কারও অজানা নয়। সেটি এখন বন্ধ হলেও আবাসন–সংকট এখনো আছে।

তবু ঢাকাতেই স্বপ্ন
বছর দুয়েক আগে আলোচনায় আসে ভারতীয় চলচ্চিত্র টুয়েলভথ ফেল। সেখানের মুখ্য চরিত্র মনোজ কুমার শর্মা প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহরে আসেন। তিনি আইপিএস কর্মকর্তা হতে চান। সে জন্য সব কষ্ট মেনে নিতে তিনি প্রস্তুত। চলচ্চিত্রের এক অংশে আটার কারখানার ছোট্ট একটি কক্ষে মেশিনের শব্দের মধ্যে তাঁকে পড়াশোনা চালিয়ে নিতে দেখা যায়। আমাদের দেশেও বিসিএস পরীক্ষার কোচিংয়ের জন্য অনেকে ঢাকায় পাড়ি জমান। হয়তো তাঁদের মধ্যে খুঁজলেও দুই-একজন ‘মনোজ কুমারকে’ পাওয়া যাবে!

দুই বছর আগে বাসা বদলের সময় মিরপুর এলাকার ত্রিশের বেশি ‘ব্যাচেলর ফ্ল্যাট’ ঘোরা হয়েছিল। বেশির ভাগই অন্ধকার ঘর। ছোট ছোট টেবিল। পড়ার জন্য স্বল্প আলোর বৈদ্যুতিক বাতি। টেবিলের ওপর বইয়ের স্তূপ। কেউ বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কারও যেকোনো সরকারি চাকরি হলেই চলবে, কেউবা বিদেশ যেতে চান। আবার কলেজপড়ুয়ারা ভালো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য লড়ছেন। ঢাকায় থাকলে এ রকম সব স্বপ্নই পূরণ করা সম্ভব—এই একটা বিশ্বাসই হয়তো তাঁদের ঘুম থেকে ওঠার প্রেরণা জোগায় প্রতিদিন।

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.